প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬
খেলাপি ঋণ কমেছিল, আবার বাড়লঃব্যাংক খাতে নতুন সংকেতা
সরেজমিন রিপোর্ট ||
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ এখনো কাটেনি। সাময়িকভাবে কমার পর আবারও বাড়তে শুরু করেছে শ্রেণিকৃত ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে যে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, ডিসেম্বর শেষে তা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায়। তবে ২০২৬ সালের মার্চে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এই ঋণ। তিন মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমলেও নতুন বছরের প্রথম প্রান্তিকেই পরিস্থিতির আবার অবনতি হয়েছে। মার্চ শেষে মোট ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশই শ্রেণিকৃত ঋণের আওতায় পড়ে।২০২৫ সালের ডিসেম্বরের পরিসংখ্যানটি দেখলে ব্যাংক খাতে কিছুটা স্বস্তির চিত্র পাওয়া যায়। সেপ্টেম্বরের ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা থেকে ডিসেম্বর শেষে শ্রেণিকৃত ঋণ কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি ৯২ লাখ টাকায় নেমে আসে। তিন মাসে কমে যায় ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার বেশি। একই সময়ে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে এই পতনকে ব্যাংক খাতের মৌলিক উন্নতি হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। বিভিন্ন ব্যাংকে বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের কারণে ডিসেম্বরের পরিসংখ্যানে খেলাপি ঋণ কমে আসে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে ঋণ আদায়ের প্রকৃত অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।নতুন বছরের শুরুতেই পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়ে প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ডিসেম্বরের তুলনায় তিন মাসে এই ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। মোট ঋণের মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাতও বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, ডিসেম্বরের সাময়িক স্বস্তির পর ব্যাংক খাতে আবারও ঋণের মান নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিলের পরও যদি নতুন করে খেলাপি বাড়তে থাকে, তাহলে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতিও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি ছিল প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সংরক্ষণ করতে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের ঘাটতির মুখে ছিল। প্রভিশন ঘাটতি থাকলে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। কারণ খেলাপি ঋণের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অর্থ সংরক্ষণ করা না গেলে ভবিষ্যতে ব্যাংকের মূলধনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ব্যাংকের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ঋণ থেকে পাওয়া সুদ। কিন্তু কোনো ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে সেই ঋণ থেকে প্রত্যাশিত আয় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়। ফলে আয় কমার পাশাপাশি ব্যয়ের চাপও বাড়ে।এর প্রভাব পড়ছে ব্যাংকের সম্পদ ও মূলধনের বিপরীতে আয়ের হারেও। একসময় যে ব্যাংক খাত ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করছিল, সেখানে এখন বেশ কিছু ব্যাংক বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে।ব্যাংক খাতের সংকট সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে। অতীতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার কারণে এসব ব্যাংকের একটি অংশে বিপুল পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ জমেছে।অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদেশি ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের হার ছিল অনেক বেশি।বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটাতে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, আদায় জোরদার এবং ব্যাংক রেজল্যুশনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৫ সালের শেষ দিকে ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিমও চালু করেছে। তবে ডিসেম্বরের পর মার্চে আবার খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় স্পষ্ট হচ্ছে, শুধু পুনঃতফসিল করলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রকৃত ঋণ আদায়, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহি, ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত মূলধন গঠন—সবগুলো ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ডিসেম্বর ২০২৫-এ খেলাপি ঋণ ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকায় নেমেছিল, কিন্তু মার্চ ২০২৬-এ আবার ৫.৮৯ লাখ কোটি টাকায় উঠেছে। ফলে ব্যাংক খাতে সাময়িক স্বস্তির পর আবারও সংকট ঘনীভূত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক-
কপিরাইট © ২০২৬ সরেজমিন নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত