প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬
পরিবারই যেন হত্যার টার্গেট, ছয় মাসে নিহত ৪৭া
সরেজমিন প্রতিবেদন ||
২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার ১৮ ঘটনা; পেছনে উঠে এসেছে জমি-সম্পত্তি, পারিবারিক বিরোধ ও মাদকের মতো কারণরংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর আগে গত জুনে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরেও একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় মা ও তাঁর তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), ইকরা (১৭) ও সিপা (১০)।শুধু রংপুর ও লক্ষ্মীপুর নয়, গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার অন্তত ১৮টি ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৪৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।ঘটনাগুলোর ধরন এক নয়। কোথাও একই পরিবারের দুজন, কোথাও তিনজন, আবার কোনো ঘটনায় চার কিংবা পাঁচজন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে জমি ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, মাদক, দাম্পত্য কলহ, পারিবারিক বিরোধ ও প্রতিশোধের মতো বিষয় সামনে এসেছে। কিছু ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।পুলিশ সদর দপ্তরে একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার বিষয়ে আলাদা কোনো পরিসংখ্যান সংরক্ষিত না থাকায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতেই এই চিত্র পাওয়া গেছে।সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পৃথক ঘটনাগুলোর তাৎক্ষণিক কারণ ভিন্ন হলেও এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে কিছু অভিন্ন সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে। পারিবারিক বিরোধের দ্রুত সমাধান না হওয়া, সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব, মাদকাসক্তি, প্রতিশোধপরায়ণতা এবং আইনগত প্রতিকার পেতে দীর্ঘসূত্রতা সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধবিষয়ক গবেষক তৌহিদুল হক মনে করেন, এসব ঘটনার সঙ্গে সামাজিক ও কাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতার সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর মতে, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পদ, প্রভাব বিস্তার ও প্রতিশোধের প্রবণতার পাশাপাশি অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার না হওয়াও সহিংসতা বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।বিশ্লেষকেরা বিশেষভাবে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, মাদকাসক্তির কারণে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং পারিবারিক সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।অন্যদিকে জমি ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধও দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘাতের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং কার্যকর সমাধানের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা।পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অপরাধের পর আসামি গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধের কারণ ও ঝুঁকি শনাক্ত করে তা প্রতিরোধের বিষয়েও পুলিশ কাজ করছে।একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের এই চিত্র জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ঘটনার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ, মাদক, সম্পত্তি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব ও স্থানীয় পর্যায়ের সংঘাত আগেভাগে শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
সম্পাদক ও প্রকাশক-
কপিরাইট © ২০২৬ সরেজমিন নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত