প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬
পাকুন্দিয়ার সড়কে দুর্ঘটনার মিছিল, মৃত্যুর শেষ কোথায়?া
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি ||
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনা যেন থামছেই না। একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতিতে উপজেলার সড়কগুলো নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। একটি দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটছে আরেকটি দুর্ঘটনা। এতে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এই মৃত্যুর মিছিলের শেষ কোথায়?গত কয়েক মাসে ঢাকা–কিশোরগঞ্জ মহাসড়কসহ পাকুন্দিয়ার বিভিন্ন সড়কে বাস, ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাস, সিএনজি, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। এসব ঘটনায় বহু মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও অনেকে।সর্বশেষ গতকাল রাতেও পাকুন্দিয়ার একটি সড়কে দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। এতে একাধিক যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকজন আহত হন। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে রাতের দুর্ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও হতাহতের সংখ্যা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।এর আগে ২২ আগস্ট বাহাদিয়া পাঁচপীরের মাজারসংলগ্ন ঢাকা–কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা দেখতে গিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় প্রাইভেটকারের ধাক্কায় নুরুজ্জামান (৬০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি করে।এর কয়েক দিন আগে, ১৯ আগস্ট সুখিয়াবাজারসংলগ্ন এগারসিন্দুর কোল্ড স্টোরেজ এলাকায় মাছবাহী ট্রাকের ধাক্কায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন।৮ আগস্ট বরাটিয়া চৌরাস্তা এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি ইজিবাইকে বাসের ধাক্কায় দুই যাত্রী নিহত হন। জুলাই মাসেও পাকুন্দিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বাস, পিকআপ ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।৬ জুলাই সুখিয়াবাজার এলাকায় বাস ও গরুবাহী পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে পিকআপে থাকা তিনজন নিহত হন। এর আগে জুন মাসেও একাধিক দুর্ঘটনায় পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী ও অটোরিকশার যাত্রীদের প্রাণহানি ঘটে।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা–কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের পাকুন্দিয়া অংশে যানবাহনের চাপ দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের অসতর্কতা এবং ট্রাফিক আইন না মানার অভিযোগও রয়েছে।মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্থানীয় যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে যানবাহন ও মানুষের চাপ তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।তবে দুর্ঘটনার দায় শুধু চালকের ওপর চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় সাইন-সিগন্যাল ও সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি জোরদার করাও জরুরি।পাকুন্দিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—কখনো দুর্ঘটনার খবর দেখতে গিয়ে মানুষ নিজেই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। নুরুজ্জামানের মৃত্যুর ঘটনা এরই একটি মর্মান্তিক উদাহরণ।দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষের ভিড়ও অনেক সময় নতুন ঝুঁকি তৈরি করে। তাই দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত পুলিশ ও উদ্ধারকারী দলের উপস্থিতি, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে রাখার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।একটি দুর্ঘটনার পর স্বজনদের কান্না, হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অনিশ্চয়তা—তারপর কিছুদিনের মধ্যেই আবার নতুন দুর্ঘটনা। এভাবেই যেন পাকুন্দিয়ার সড়কে দুর্ঘটনা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হচ্ছে।প্রশ্ন হলো, আরও কত প্রাণ গেলে এই পরিস্থিতি বদলাবে?স্থানীয়দের দাবি, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, বেপরোয়া চালনা বন্ধ, চালকদের দক্ষতা যাচাই, অবৈধ ও অনিরাপদ যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং মহাসড়কে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে।সড়ক দুর্ঘটনা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। প্রতিটি প্রাণহানির পেছনে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। তাই পাকুন্দিয়ার সড়কে আর কত প্রাণ ঝরার পর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এ প্রশ্নের উত্তর এখন স্থানীয়দের কাছেই নয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও জরুরি হয়ে উঠেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক-
কপিরাইট © ২০২৬ সরেজমিন নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত