শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬
সরেজমিন নিউজ

আমরা কি শুধু বাছাই করা ন্যায়বিচার চাই?



আমরা কি শুধু বাছাই করা ন্যায়বিচার চাই?

যখন লিখতে বসেছি তখন রাত দুইটা বাজে। প্রচণ্ড গরমে কারওয়ান বাজার থেকে সাড়ে এগারোটায় গাড়িতে উঠে দেখি রাস্তায় ভয়াবহ যানজট। জানতে পারলাম, মিরপুর ১০ গোলচত্বর অবরুদ্ধ করে শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যার বিচার দাবি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে কোনো নৃশংস ঘটনার পর মানুষের ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের দাবি উঠবে এটাই স্বাভাবিক। একটি সভ্য সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, সেটাই কাম্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমানভাবে দাঁড়াই, নাকি শুধু সেই ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধেই সোচ্চার হই, যেগুলো আমাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে মানানসই?

 

মিরপুরে রামিসার মৃত্যুর ঘটনায় মানুষ রাস্তায় নেমেছে। বিচারের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু সেই আন্দোলনের ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত রাস্তা আটকে রেখে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা কি ন্যায়বিচারের আন্দোলনের অংশ হওয়া উচিত? অসুস্থ রোগী, পরীক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ; তাদের কষ্ট কি আন্দোলনের কাছে অদৃশ্য? একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি আরও হাজারো নিরীহ মানুষকে কষ্ট দেওয়া হয়, তাহলে সেই প্রতিবাদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

আরও বড় প্রশ্ন হলো সব ঘটনার ক্ষেত্রে কি আমরা একই আবেগ দেখাই?

গতকাল শিহাব হোসেন (২০) নামের মাদ্রাসাছাত্রকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে ১০ বছর বয়সি এক মাদ্রাসাপড়ুয়া শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে। কিন্তু রামিসার ঘটনার মতো সেই ঘটনা নিয়ে কোনো আন্দোলন চোখে পড়েনি। আইনের চোখে অপরাধীর ধর্ম নেই, কিন্তু আমাদের প্রতিবাদের যেন ধর্ম আছে! এটি শুধু একটি সাধারণ উদাহরণ মাত্র।

হিন্দু যুবক দিপু দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে বড় কোনো আন্দোলন দেখা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া রাস্তায় নামা মানুষের সংখ্যা ছিল নগণ্য। কেন? একজন সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে কি তার জীবনের মূল্য কমে যায়?

একইভাবে, সম্প্রতি মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের খবরও সামনে আসছে। অভিযোগের তীর ধর্মীয় পোশাকধারী শিক্ষকদের দিকে। কিন্তু সেই ঘটনাগুলোতেও বড় ধরনের বিক্ষোভ বা ধর্মীয় নেতাদের জোরালো অবস্থান খুব কমই দেখা গেছে। বরং অনেক সময় এসব ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। শিশু নির্যাতনকারী যদি একজন ধর্মীয় পরিচয় বহনকারী ব্যক্তি বা ধর্মগুরু হন, তাহলে কি অপরাধের ভয়াবহতা কমে যায়?

 

কিছু আন্দোলনে “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার” স্লোগানও ব্যবহার করা হচ্ছে এমন এক প্রসঙ্গে, যার সঙ্গে ধর্মের সরাসরি সম্পর্ক নেই। ন্যায়বিচারের দাবিকে ধর্মীয় পরিচয়ের মোড়কে ঢুকিয়ে দিলে সমাজ আরও বিভক্ত হয়। বিচার তখন মানবিক ও আইনি প্রশ্ন না হয়ে পরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত হয়।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আজ এক অদ্ভূত ও উদ্বেগজনক নীরবতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পতিত আওয়ামী সরকারের কোনো সমর্থক বা কর্মী যখন আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, এমনকি খুন হচ্ছেন, তখন তাদের দলীয় নেতাকর্মী ছাড়া সমাজের অন্য কোনো অংশ থেকে ন্যায়বিচারের দাবি উঠছে না বললেই চলে। নির্বাহী আদেশে দলটির কার্যক্রম স্থগিত থাকায় তাদের প্রতিবাদ আজ কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দেয়ালেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতাবলম্বী বা সাবেক শাসকদলের সমর্থক হওয়ার কারণেই কি একজন মানুষ নাগরিক হিসেবে তার মৌলিক সুরক্ষার অধিকার হারাবেন? রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের প্রধান শর্ত। আজ যদি রাজনৈতিক ভিন্নতার কারণে আমরা কারও প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নিই কিংবা তাদের ওপর হওয়া অন্যায়ের সামনে চুপ থাকি, তবে তা প্রকারান্তরে আরেকটি বৈষম্যমূলক ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থারই পথ প্রশস্ত করে।

 

আমাদের সমাজে আজ যেন এক ধরনের “সিলেক্টিভ জাস্টিস” সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। নিজের মতাদর্শ, ধর্মীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিললে আমরা গর্জে উঠি, আর না মিললে নীরব থাকি। এই নীরবতা শুধু ভণ্ডামি নয়, এটি ভবিষ্যতের অন্যায়ের জন্যও পথ তৈরি করে।

 

ন্যায়বিচার যদি সত্যিই চাই, তাহলে সেটি হতে হবে সবার জন্য সমান, হিন্দু দিপু দাসের জন্যও, মাদ্রাসার নির্যাতিত শিশুর জন্যও, রামিসার জন্যও। যে সমাজ অপরাধীর পরিচয় দেখে প্রতিবাদ করে, সে সমাজ একদিন অপরাধকেই স্বাভাবিক করে ফেলে।

একজনের জন্য রাস্তায় নামব, আর অন্যজনের জন্য চুপ থাকব; এমন সমাজ কখনো ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না।

আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি সত্যিকারের ন্যায়বিচার চাই, নাকি চাই শুধু বাছাই করা ন্যায়বিচার?

 

আপনার মতামত লিখুন

সরেজমিন নিউজ

শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬


আমরা কি শুধু বাছাই করা ন্যায়বিচার চাই?

প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬

featured Image

যখন লিখতে বসেছি তখন রাত দুইটা বাজে। প্রচণ্ড গরমে কারওয়ান বাজার থেকে সাড়ে এগারোটায় গাড়িতে উঠে দেখি রাস্তায় ভয়াবহ যানজট। জানতে পারলাম, মিরপুর ১০ গোলচত্বর অবরুদ্ধ করে শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যার বিচার দাবি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে কোনো নৃশংস ঘটনার পর মানুষের ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের দাবি উঠবে এটাই স্বাভাবিক। একটি সভ্য সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, সেটাই কাম্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমানভাবে দাঁড়াই, নাকি শুধু সেই ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধেই সোচ্চার হই, যেগুলো আমাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে মানানসই?

 

মিরপুরে রামিসার মৃত্যুর ঘটনায় মানুষ রাস্তায় নেমেছে। বিচারের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু সেই আন্দোলনের ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত রাস্তা আটকে রেখে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা কি ন্যায়বিচারের আন্দোলনের অংশ হওয়া উচিত? অসুস্থ রোগী, পরীক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ; তাদের কষ্ট কি আন্দোলনের কাছে অদৃশ্য? একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি আরও হাজারো নিরীহ মানুষকে কষ্ট দেওয়া হয়, তাহলে সেই প্রতিবাদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

আরও বড় প্রশ্ন হলো সব ঘটনার ক্ষেত্রে কি আমরা একই আবেগ দেখাই?

গতকাল শিহাব হোসেন (২০) নামের মাদ্রাসাছাত্রকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে ১০ বছর বয়সি এক মাদ্রাসাপড়ুয়া শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে। কিন্তু রামিসার ঘটনার মতো সেই ঘটনা নিয়ে কোনো আন্দোলন চোখে পড়েনি। আইনের চোখে অপরাধীর ধর্ম নেই, কিন্তু আমাদের প্রতিবাদের যেন ধর্ম আছে! এটি শুধু একটি সাধারণ উদাহরণ মাত্র।

হিন্দু যুবক দিপু দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে বড় কোনো আন্দোলন দেখা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া রাস্তায় নামা মানুষের সংখ্যা ছিল নগণ্য। কেন? একজন সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে কি তার জীবনের মূল্য কমে যায়?

একইভাবে, সম্প্রতি মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের খবরও সামনে আসছে। অভিযোগের তীর ধর্মীয় পোশাকধারী শিক্ষকদের দিকে। কিন্তু সেই ঘটনাগুলোতেও বড় ধরনের বিক্ষোভ বা ধর্মীয় নেতাদের জোরালো অবস্থান খুব কমই দেখা গেছে। বরং অনেক সময় এসব ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। শিশু নির্যাতনকারী যদি একজন ধর্মীয় পরিচয় বহনকারী ব্যক্তি বা ধর্মগুরু হন, তাহলে কি অপরাধের ভয়াবহতা কমে যায়?

 

কিছু আন্দোলনে “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার” স্লোগানও ব্যবহার করা হচ্ছে এমন এক প্রসঙ্গে, যার সঙ্গে ধর্মের সরাসরি সম্পর্ক নেই। ন্যায়বিচারের দাবিকে ধর্মীয় পরিচয়ের মোড়কে ঢুকিয়ে দিলে সমাজ আরও বিভক্ত হয়। বিচার তখন মানবিক ও আইনি প্রশ্ন না হয়ে পরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত হয়।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আজ এক অদ্ভূত ও উদ্বেগজনক নীরবতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পতিত আওয়ামী সরকারের কোনো সমর্থক বা কর্মী যখন আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, এমনকি খুন হচ্ছেন, তখন তাদের দলীয় নেতাকর্মী ছাড়া সমাজের অন্য কোনো অংশ থেকে ন্যায়বিচারের দাবি উঠছে না বললেই চলে। নির্বাহী আদেশে দলটির কার্যক্রম স্থগিত থাকায় তাদের প্রতিবাদ আজ কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দেয়ালেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতাবলম্বী বা সাবেক শাসকদলের সমর্থক হওয়ার কারণেই কি একজন মানুষ নাগরিক হিসেবে তার মৌলিক সুরক্ষার অধিকার হারাবেন? রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের প্রধান শর্ত। আজ যদি রাজনৈতিক ভিন্নতার কারণে আমরা কারও প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নিই কিংবা তাদের ওপর হওয়া অন্যায়ের সামনে চুপ থাকি, তবে তা প্রকারান্তরে আরেকটি বৈষম্যমূলক ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থারই পথ প্রশস্ত করে।

 

আমাদের সমাজে আজ যেন এক ধরনের “সিলেক্টিভ জাস্টিস” সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। নিজের মতাদর্শ, ধর্মীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিললে আমরা গর্জে উঠি, আর না মিললে নীরব থাকি। এই নীরবতা শুধু ভণ্ডামি নয়, এটি ভবিষ্যতের অন্যায়ের জন্যও পথ তৈরি করে।

 

ন্যায়বিচার যদি সত্যিই চাই, তাহলে সেটি হতে হবে সবার জন্য সমান, হিন্দু দিপু দাসের জন্যও, মাদ্রাসার নির্যাতিত শিশুর জন্যও, রামিসার জন্যও। যে সমাজ অপরাধীর পরিচয় দেখে প্রতিবাদ করে, সে সমাজ একদিন অপরাধকেই স্বাভাবিক করে ফেলে।

একজনের জন্য রাস্তায় নামব, আর অন্যজনের জন্য চুপ থাকব; এমন সমাজ কখনো ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না।

আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি সত্যিকারের ন্যায়বিচার চাই, নাকি চাই শুধু বাছাই করা ন্যায়বিচার?

 


সরেজমিন নিউজ


কপিরাইট © ২০২৬ সরেজমিন নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত