আবাসিকের লাইনের গ্যাস কিংবা সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে অগ্নিকান্ডের দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। রাজধানীসহ সারাদেশে একের পর এক গ্যাসের লিকেজ থেকে দুর্ঘটনায় পুড়ছে তাজা প্রাণ। অগ্নিদুর্ঘটনায় ঝলসে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন তারা। গ্যাসের লিকেজে অগ্নিকান্ডের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে ঠাঁই হচ্ছে না দগ্ধদের। আগুনে পোড়া রোগির বিশেষায়িত হাসপাতাল বার্ন ইউনিটের করিডোর ও মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামের হালিশহর, রাজধানীর হাজারীবাগ এবং মুগদা ও বাড্ডা এলাকায় গ্যাসের লিকেজ থেকে দগ্ধদের সিংহভাগ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের তুলনায় গ্যাসের লিকেজ থেকে অগ্নিদুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা কম। কারণ সিলিন্ডারের ধারণক্ষমতা অনেক বেশি। অবৈধ গ্যাসের লাইনের কারণেই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। আবার গত দুই বছরে দেশে বেশ কয়েকবার ভূমিকম্প হয়েছে। এ সময় মাটির নিচে যে গ্যাসের পাইপলাইন আছে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানে অনেক লিকেজ হতেই পারে। কারণ এই লাইনগুলো ৫০ বছরের পুরোনো। লিকেজ দুর্ঘটনা এড়াতে গ্যাসের গ্রাহকদের ঘরে ব্র্যান্ডের ভালোমানের গ্যাস সিলিন্ডারের যন্ত্রপাতি সরঞ্জাম ব্যবহার করা উচিত।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, রাজধানীতে অগ্নিদুর্ঘটনার প্রায় ৩০ ভাগই গ্যাসের পাইপলাইনের ছিদ্র থেকে। বিভিন্ন শহরে যে গ্যাস সরবরাহ লাইন সম্প্রসারিত হয়েছে, তার ৭০ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। খোদ রাজধানীতে অর্ধশত বছরের পুরোনো লাইনও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অবৈধ সংযোগ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের গ্যাস সরবরাহ লাইন ও সংযোগ ভঙ্গুর ও ঝুঁকিপূর্ণ একারনেই দুর্ঘটনা। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে বাসাবাড়িতে গ্যাসলাইন বসানোর কাজ করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। কিন্তু তারা একবার লাইন বসানো ও সংযোগ দেওয়ার পর খোঁজও নেয় না, সেটি কী অবস্থায় আছে। অনেক সময় গ্রাহকেরা তাদের সহায়তা চেয়েও পান না। বাধ্য হয়ে তারা আনাড়ি মিস্ত্রি দিয়ে মেরামতের কাজ করান। ফলে ঘটে যাচ্ছে একের পর এক এ রকম বড় দুর্ঘটনা।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, সাধারণত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আগে লিকেজ বেশি হয়। আর রান্নাঘরে ভেন্টিলেশনের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় কোনো স্থানে বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ থাকলে এবং সেখানে কোনো গ্যাস লিকেজ থাকলে সেটি তখন জমাটবদ্ধ গ্যাসে পরিণত হয়। তখন যেকোনো স্পার্ক বা ম্যাচের কাঠি জ্বালানো হলেই তা বিস্ফোরকে পরিণত হয়। তবে সহজেই সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয় না। আবার সিলিন্ডারের একটি মেয়াদ থাকে। যা এর গায়ে লেখা থাকে। আর এটি মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও বিস্ফোরক অধিদপ্তর এগুলো পরীক্ষা করতে পারে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে সিলিন্ডারের মান কেমন তা যাচাই করা যায়। এজন্য প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পর এই সিলিন্ডারগুলো পরীক্ষা করা উচিত। আবার সিলিন্ডারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি যেমন- হোসপাইপ, রেগুলেটর, বালব এগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এগুলোর মান পরীক্ষা করা উচিত। মানুষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ মানের এবং কমদামি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে আগ্রহী। সেখানেই তারা ভুল করেন। এ ক্ষেত্রে তারা জীবনের সঙ্গে সমঝোতা করেন। ব্যবহারকারীকে লিকেজ দুর্ঘটনা এড়াতে ব্র্যান্ডের ভালোমানের গ্যাস সিলিন্ডারের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা উচিত।
এবিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, একটু সচেতন হলেই বিস্ফোরণ রোধ করা সম্ভব, শুধু লিকেজের কারণে এ রকম বিস্ফোরণের ঘটনা অহরহ ঘটছে, যা খুবই মর্মান্তিক। এ ক্ষেত্রে মানুষজনের সচেতন হলে অনেক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হতো। যেমন চুলা জ্বালানোর আগে রান্নাঘরের জানালা, এডজস্ট ফ্যান চালু করে দিয়ে ঘরের জমানো গ্যাস বের করে দিয়ে তারপর আগুন ধরানো। কিন্তু আমরা অনেকেই তড়িঘড়ি করতে গিয়ে এসব ভুলে যাই। যার খেসারত দিতে হয় পুরো পরিবারকে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস ডিটেকটর নামক একটি যন্ত্র রয়েছে। কিন্তু এর প্রচারণা এত কম যে অনেক শিক্ষিত মানুষও এটার সম্পর্কে জানে না। তাই আমি মনে করি গ্যাস লিকেজ থেকে দুর্ঘটনা রোধ করতে এই যন্ত্রটি সহজলভ্য করার পাশাপাশি প্রচারণা বাড়ানো প্রয়োজন।
গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনার পর সাধারণত তদন্ত করে বিস্ফোরক পরিদপ্তর। তাতে গতানুগতিক কিছু সুপারিশ থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষতি কমানো যায় কি না সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা থাকে না। প্রথমবারের মতো মগবাজারের বিস্ফোরণের পর গ্যাস ডিটেকটরের বিষয়টি সুপারিশে উল্লেখ করে বিস্ফোরক পরিদপ্তর।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. আসাদুল বলেন, নিজের বাড়িতে কেউ গ্যাস ডিটেকটর বসাবে কি বসাবে না সেটা একান্তই একজনের ব্যক্তিগত বিষয়। একজন যদি তার নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবে, তাহলে সে এটি তার বাসায় বসাবে, না হলে তো তাকে জোর-জবরদস্তি করা যাবে না। পাইপলাইনে গ্যাসের লিকেজের গন্ধই যখন বুঝতে পারে না, তখন ডিটেকটর ব্যবহার করা কঠিন। তিনি বলেন, বাসা-বাড়িতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাসার কাজের সহকারী রান্না করে থাকেন। যারা গ্যাস ডিটেকটর মেশিনের সিগন্যাল বোঝা মুশকিল। সাধারণ মানুষদের আগে শিখতে হবে গ্যাসের গন্ধ কেমন সেটা। গ্যাস ডিটেকটর যন্ত্র স্থাপনে প্রশিক্ষণও দরকার।
তিতাসের তথ্য মতে, বাসাবাড়িতে চাইলেই এই গ্যাস ডিটেকটর যন্ত্র বসানো যায়। এটি পাওয়া যায় বিভিন্ন ই-কমার্স সাইটেই। দাম ১২০০-২০০০ টাকার মধ্যে। রান্নাঘর বা গ্যাসের লাইন রয়েছে এমন স্থানে এটি স্থাপন করা যেতে পারে। লিকেজ হলেই বেজে উঠবে অ্যালার্ম, যাতে বড় দুর্ঘটনার আগেই লোকজন নিরাপদে সরে যেতে পারবে।
ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০২৫ সালে সারা দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি এবং দিনে গড়ে ৭৫টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক গোলযোগ, বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা, চুলা এবং গ্যাস সিলিন্ডার ও সরবরাহ লাইন লেকেজের কারণেই বেশি আগুনের ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, ২০২৫ সালে শুধু গ্যাস সরবরাহ লাইন লিকেজ থেকে ৫৬২টি এবং গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ১২১টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এসবের মধ্যে বাসাবাড়ি বা আবাসিক ভবনেই সবচেয়ে বেশি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। সারা দেশে বাসাবাড়িতে মোট ৮ হাজার ৭০৫টি আগুন লাগে, যা মোট আগুনের ৩২.১৭ শতাংশ। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৬৭ জন এবং নিহত হয়েছেন ৮৫ জন।
এছাড়া গত ২০২৪ সালে শুধু গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ, বিস্ফোরণ, লাইন লিকেজের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ২১৩টি। এর মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজের দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭০৪টি, বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে ৪৪টি আর সরবরাহ লাইনের লিকেজ থেকে অগ্নিকান্ড ঘটনা ঘটেছে ৪৬৫টি। আর এতে ক্ষতি হয়েছে ৯১ লাখ ৭৮ হাজার ৩২৪ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে দেশজুড়ে ২৭ হাজার ৬২৪টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব অগ্নিকান্ডে ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ ৮২ হাজার ১৪ টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। নিহত হয়েছেন ১০২ জন, আহত হয়েছেন ২৮১ জন। যার মধ্যে গ্যাসের লাইন লিকেজ থেকে ৭৭০টি, গ্যাস সিলিন্ডার ও বয়লার বিস্ফোরণ থেকে ১২৫টি এবং বাজি পোড়ানো থেকে ৮৭টি আগুনের ঘটনা ঘটে।
শিরোনাম :
গর্জনিয়ায় ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত
ঝিনাইদহে কৃষকদল নেতার লাশ নিয়ে বিএনপির বিক্ষোভ
সড়ক দূর্ঘটনা রোধে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে কুষ্টিয়ায় মানববন্ধন
নালিতাবাড়ীতে সিসি ব্লক তৈরির অবৈধ কারখানা
শ্বশুর বাড়ি যাওয়া হলোনা ফরহাদের
লালপুরে ইছামতি খালের কচুরিপানা অপসরণ শুরু
ডেঙ্গু প্রতিরোধে কুড়িগ্রামে সচেতনতা র্যালি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান
নড়িয়ার ঈদ উপহার বিতরণ করলেন এমপি কিরণ
মৌলভীবাজারে প্রবাসীর বাগান বাড়ীতে আগুন
মজুদকৃত তেল গোপনে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ
গ্যাস লিকেজ নাকি মৃত্যুর পরোয়ানা
-
হালিম মোহাম্মদ - প্রকাশ : 10:12 pm, Monday, 2 March 2026
- 196
ট্যাগ :
আলোচিত

