Dhaka , Monday, 16 March 2026

পাটুরিয়া ফেরিঘাটে বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তাদের চাঁদাবাজির অভিযোগ

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ফেরিঘাটে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। ট্রাক পারাপারের টিকিট কাউন্টারে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে চালকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের নামে চাঁদাবাজির মহোৎসব চলছে। প্রতিবাদ করলেই জুটছে শারীরিক লাঞ্ছনা ও হয়রানি। এমনকি দুর্নীতির খবর ঢাকতে রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক প্রলোভন দেখানোর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে ভুক্তভোগি চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিসি’র কাউন্টারে প্রতিটি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপসহ এ ধরনের যানবাহন থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।
ট্রাক চালক জসিম সিকদার জানান, তার কাছ থেকে ২১০০ টাকা নেওয়া হলেও ফেরিতে ওঠা এবং অবস্থানকালে দফায় দফায় আর ও টাকা দিতে হয়েছে।
কভার্ডভ্যান চালক তাজমির অভিযোগ করেন, তার কাছ থেকে ২২০০ টাকা রাখা হলেও টিকিটে লেখা হয়েছে ২১০০ টাকা।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাকে। খালি ট্রাক হওয়া সত্ত্বেও মুরগির বাচ্চা পরিবহনের দোহাই দিয়ে ১৫৫০ টাকার পরিবর্তে ১৭০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছে বিআইডব্লিউটিসি পাটুরিয়াঘাটের কাউন্টার টিম লিডাররা। কাউন্টারে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে এই চক্রটি পরিচালিত হয়। বিআইডব্লিউটিসি’র পাটুরিয়া কাউন্টারের টিম লিডার রায়হান উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রাথমিকভাবে ফোনে ঘাটে অনুপস্থিত থাকার দাবি করলেও পরে মুখোমুখি হয়ে তিনি প্রতিটি গাড়ি থেকে অতিরিক্ত ৫০ টাকা চাঁদা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে চালকদের দাবি, এই অঙ্ক আর ও অনেক বেশি। তথ্য সংগ্রহে যাওয়া সাংবাদিকদের সামনেই এক চালকের সহকারী ১০০ টাকা বেশি নেয়ার কথা বললে ধমক দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেন তিনি।
চাঁদাবাজির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে টিম লিডার রায়হান উদ্দিন নানা উছিলায় পাবনার এক সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ লোক পরিচয় দিয়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয়, অনিয়মের খবর ধামাচাপা দিতে তিনি সাংবাদিকদের আর্থিক সুবিধার প্রস্তাব ও দেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য ও বক্তব্য দেওয়ার কথা থাকলে নির্ধারিত সময়ে নিজাম উদ্দিনসহ অন্য টিম লিডাররা গা-ঢাকা দেন, যা তাদের সম্পৃক্ততাকে আরও স্পষ্ট করে।
এ ব্যাপারে ফোনে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসি আরিচা কার্যালয়ের ডিজিএম (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুস সালাম বলেন, টিম লিডারদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জেনে আপনাদের জানাব।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই প্রকাশ্য চাঁদাবাজিতে সাধারণ ট্রাকচালকরা দিশেহারা। টাকা দিতে দেরি হলে বা প্রতিবাদ করলে সিরিয়াল ভেঙে ট্রাক আটকে রাখা হয়। পরিবহন শ্রমিকদের অভিযোগ, এই বিশাল অঙ্কের টাকার ভাগ উপরমহল পর্যন্ত পৌঁছায় বলেই কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ভুক্তভোগী চালক ও মালিকরা এই ‘সিন্ডিকেট সন্ত্রাসের’ অবসান ঘটাতে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে সরকারের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

আলোচিত

পাটুরিয়া ফেরিঘাটে বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তাদের চাঁদাবাজির অভিযোগ

প্রকাশ : 04:05 pm, Thursday, 12 March 2026

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ফেরিঘাটে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। ট্রাক পারাপারের টিকিট কাউন্টারে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে চালকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের নামে চাঁদাবাজির মহোৎসব চলছে। প্রতিবাদ করলেই জুটছে শারীরিক লাঞ্ছনা ও হয়রানি। এমনকি দুর্নীতির খবর ঢাকতে রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক প্রলোভন দেখানোর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে ভুক্তভোগি চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিসি’র কাউন্টারে প্রতিটি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপসহ এ ধরনের যানবাহন থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।
ট্রাক চালক জসিম সিকদার জানান, তার কাছ থেকে ২১০০ টাকা নেওয়া হলেও ফেরিতে ওঠা এবং অবস্থানকালে দফায় দফায় আর ও টাকা দিতে হয়েছে।
কভার্ডভ্যান চালক তাজমির অভিযোগ করেন, তার কাছ থেকে ২২০০ টাকা রাখা হলেও টিকিটে লেখা হয়েছে ২১০০ টাকা।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাকে। খালি ট্রাক হওয়া সত্ত্বেও মুরগির বাচ্চা পরিবহনের দোহাই দিয়ে ১৫৫০ টাকার পরিবর্তে ১৭০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছে বিআইডব্লিউটিসি পাটুরিয়াঘাটের কাউন্টার টিম লিডাররা। কাউন্টারে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে এই চক্রটি পরিচালিত হয়। বিআইডব্লিউটিসি’র পাটুরিয়া কাউন্টারের টিম লিডার রায়হান উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রাথমিকভাবে ফোনে ঘাটে অনুপস্থিত থাকার দাবি করলেও পরে মুখোমুখি হয়ে তিনি প্রতিটি গাড়ি থেকে অতিরিক্ত ৫০ টাকা চাঁদা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে চালকদের দাবি, এই অঙ্ক আর ও অনেক বেশি। তথ্য সংগ্রহে যাওয়া সাংবাদিকদের সামনেই এক চালকের সহকারী ১০০ টাকা বেশি নেয়ার কথা বললে ধমক দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেন তিনি।
চাঁদাবাজির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে টিম লিডার রায়হান উদ্দিন নানা উছিলায় পাবনার এক সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ লোক পরিচয় দিয়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয়, অনিয়মের খবর ধামাচাপা দিতে তিনি সাংবাদিকদের আর্থিক সুবিধার প্রস্তাব ও দেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য ও বক্তব্য দেওয়ার কথা থাকলে নির্ধারিত সময়ে নিজাম উদ্দিনসহ অন্য টিম লিডাররা গা-ঢাকা দেন, যা তাদের সম্পৃক্ততাকে আরও স্পষ্ট করে।
এ ব্যাপারে ফোনে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসি আরিচা কার্যালয়ের ডিজিএম (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুস সালাম বলেন, টিম লিডারদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জেনে আপনাদের জানাব।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই প্রকাশ্য চাঁদাবাজিতে সাধারণ ট্রাকচালকরা দিশেহারা। টাকা দিতে দেরি হলে বা প্রতিবাদ করলে সিরিয়াল ভেঙে ট্রাক আটকে রাখা হয়। পরিবহন শ্রমিকদের অভিযোগ, এই বিশাল অঙ্কের টাকার ভাগ উপরমহল পর্যন্ত পৌঁছায় বলেই কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ভুক্তভোগী চালক ও মালিকরা এই ‘সিন্ডিকেট সন্ত্রাসের’ অবসান ঘটাতে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে সরকারের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।