Dhaka , Monday, 16 March 2026

সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী হরিপুর জমিদার বাড়ির

 

 

সংরক্ষণের অভাবে একসময় হারিয়ে যাবে চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী হরিপুর জমিদার (চৌধুরী) বাড়ি। জমিদারদের মৃত্যুর পরে এই বাড়িতে এখন মাত্র কয়েকটি পরিবারের বসবাস। সবুজে ঘেরা খুবই মনোমুগ্ধকর পরিবেশ এবং নানা শৈল্পিক নকশায় নির্মাণকৃত জমিদারদের ভবনগুলো কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সংরক্ষিত হলে ভ্রমণ পিপাসু কিংবা সিনেমার সুটিংয়ের জন্য এটি হতে পারে অন্যতম কেন্দ্র। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে।
সরেজমিন জমিদার বাড়ি ঘুরে ওই বাড়ির বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, দর্শনার্থী, শিক্ষক ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানাগেছে।
জেলা শহরের পালবাজার ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশা করে চান্দ্রা চৌরাস্তায় যাওয়া যাবে। জনপ্রতি বাড়া নিবে ৫০টাকা। চৌরাস্তা থেকে জমিদার বাড়িতে অটোরিকশা করে যেতে পারবেন জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০টাকা করে।
জমিদার বাড়ি হিসেবে এই বাড়িতে সব কিছুই আছে। বাড়িতে বেশ কয়েকটি পুকুর, পুকুর ঘাট, মসজিদ, মসজিদের পাশে জমিদারদের কবর, এতিমখানা, ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং হরিপুর বাজার রয়েছে। বাড়িতে প্রবেশ করার জন্য রয়েছে একটি গেট। খুবই নিরিবিলি পরিবেশ। বাড়ির চার দিকে অনেক গাছ।
জমিদার বাড়ির বাসিন্দা গোফরান চৌধুরী বলেন, আমাদের পূর্ব পুরুষরা এই বাড়িতে শতবছর বসবাস করেছেন। তারা অধিকাংশই ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। এখন আমরা ৭ পরিবার বাড়িতে আছি। আমরা চতুর্থ প্রজন্ম। আমাদের বাবা-চাচারা অনেকে বিভিন্ন পদে সরকারি চাকরি করতেন। জানতে পেরেছি রূপসা জমিদার বাড়ি আর আমাদের বাড়ির লোকজন এলাকায় খাজনা তুলতেন। কারণ অনেক সম্পত্তির মালিক ছিলেন তারা। বিশেষ করে মরহুম কামিজ রাজা, জমিদার মৌলভী মতিরাজা, উমেদ রাজা, মহাম্মদ রাজা সহ সাতজন জমিদার প্রায় শতবছর বসবাস করেন এই বাড়িতে।
ওই বাড়ির আরেক বাসিন্দা মো. ইমরুল হুদা চৌধুরী বলেন, তাদের বাড়ির অনেক লোকজন চাঁদপুর শহরে চৌধুরী পাড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং যুক্তরাজ্যে আছেন। অনেকে বছরে একবার বাড়িতে আসেন প্রয়াতদের জন্য দোয়া করানোর জন্য। কিন্তু তাদের বিল্ডিং বাড়ি সংরক্ষণ করার কেউ নেই।
তিনি আরো বলেন, আমাদের বাড়িতে কয়েকবছর আগে গিয়স উদ্দিন সেলিম পরিচালিত ‘পাপ পূণ্য’ সিনেমার সুটিং হয়েছে। মূলত যারাই আমাদের বাড়িতে আসে ঘুরতে কিংবা কাজে আসে তাদের জন্য আমাদের সহযোগিতা থাকে। এখন প্রয়োজন ঐতিহ্যবাহি এই বাড়িটি সংরক্ষণ।
জমিদার বাড়ির আমির হোসেন। চান্দ্রা উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে। হোসেন বলেন, জানতে পেরেছি আমাদের পূর্ব পুরুষরা জমিদার ছিলেন। এটি জেনে আমার কাছে খুবই ভালো লাগে। অনেকেই আমাদের বাড়ি দেখতে আসেন।
এই বাড়িতে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী এমরান হোসেন বলেন, শহর থেকে বাড়িটে দেখার জন্য এসেছি। পুরো বাড়ি ঘুরে আমার খুবই ভালো লেগেছে। বিশেষ করে পুরনো ভবনগুলো নকশা করা খুবই চমৎকার। তবে এই বাড়িটি সংরক্ষণ করা দরকার। আর না হয় জমিদারদের স্মৃতিগুলো হারিয়ে যাবে।
ওই বাড়ির সামনে থাকা হরিপুর নেছারিয়া ডিগ্রি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নুর মোহাম্মদ খান বলেন, জমিদার বাড়ির লোকজনের কারণে এলাকার বহু মানুষ উপকৃত। তাদের মধ্যে অনেকেই ধার্মিক ছিলেন এবং মাদ্রাসায় উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন।
মাদ্রাসার শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, শুধুমাত্র মাদ্রাসাই নয়, এখানে এতিমখানা, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন জমিদার বংশের লোকেরা। এখনো তারা সামাজিক কাজে সহযোগিতা করেন।
চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম.এন জামিউল হিকমা বলেন, হরিপুর চৌধুরী বাড়ির লোকজন জমিদার ছিলেন এবং বাড়িটি খুইব সুন্দর জেনেছি। শুনেছি সিনেমার সুটিং হয়েছে। কিন্তু আমার যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে এই বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হবে।

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

আলোচিত

সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী হরিপুর জমিদার বাড়ির

প্রকাশ : 02:35 pm, Saturday, 14 March 2026

 

 

সংরক্ষণের অভাবে একসময় হারিয়ে যাবে চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী হরিপুর জমিদার (চৌধুরী) বাড়ি। জমিদারদের মৃত্যুর পরে এই বাড়িতে এখন মাত্র কয়েকটি পরিবারের বসবাস। সবুজে ঘেরা খুবই মনোমুগ্ধকর পরিবেশ এবং নানা শৈল্পিক নকশায় নির্মাণকৃত জমিদারদের ভবনগুলো কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সংরক্ষিত হলে ভ্রমণ পিপাসু কিংবা সিনেমার সুটিংয়ের জন্য এটি হতে পারে অন্যতম কেন্দ্র। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে।
সরেজমিন জমিদার বাড়ি ঘুরে ওই বাড়ির বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, দর্শনার্থী, শিক্ষক ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানাগেছে।
জেলা শহরের পালবাজার ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশা করে চান্দ্রা চৌরাস্তায় যাওয়া যাবে। জনপ্রতি বাড়া নিবে ৫০টাকা। চৌরাস্তা থেকে জমিদার বাড়িতে অটোরিকশা করে যেতে পারবেন জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০টাকা করে।
জমিদার বাড়ি হিসেবে এই বাড়িতে সব কিছুই আছে। বাড়িতে বেশ কয়েকটি পুকুর, পুকুর ঘাট, মসজিদ, মসজিদের পাশে জমিদারদের কবর, এতিমখানা, ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং হরিপুর বাজার রয়েছে। বাড়িতে প্রবেশ করার জন্য রয়েছে একটি গেট। খুবই নিরিবিলি পরিবেশ। বাড়ির চার দিকে অনেক গাছ।
জমিদার বাড়ির বাসিন্দা গোফরান চৌধুরী বলেন, আমাদের পূর্ব পুরুষরা এই বাড়িতে শতবছর বসবাস করেছেন। তারা অধিকাংশই ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। এখন আমরা ৭ পরিবার বাড়িতে আছি। আমরা চতুর্থ প্রজন্ম। আমাদের বাবা-চাচারা অনেকে বিভিন্ন পদে সরকারি চাকরি করতেন। জানতে পেরেছি রূপসা জমিদার বাড়ি আর আমাদের বাড়ির লোকজন এলাকায় খাজনা তুলতেন। কারণ অনেক সম্পত্তির মালিক ছিলেন তারা। বিশেষ করে মরহুম কামিজ রাজা, জমিদার মৌলভী মতিরাজা, উমেদ রাজা, মহাম্মদ রাজা সহ সাতজন জমিদার প্রায় শতবছর বসবাস করেন এই বাড়িতে।
ওই বাড়ির আরেক বাসিন্দা মো. ইমরুল হুদা চৌধুরী বলেন, তাদের বাড়ির অনেক লোকজন চাঁদপুর শহরে চৌধুরী পাড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং যুক্তরাজ্যে আছেন। অনেকে বছরে একবার বাড়িতে আসেন প্রয়াতদের জন্য দোয়া করানোর জন্য। কিন্তু তাদের বিল্ডিং বাড়ি সংরক্ষণ করার কেউ নেই।
তিনি আরো বলেন, আমাদের বাড়িতে কয়েকবছর আগে গিয়স উদ্দিন সেলিম পরিচালিত ‘পাপ পূণ্য’ সিনেমার সুটিং হয়েছে। মূলত যারাই আমাদের বাড়িতে আসে ঘুরতে কিংবা কাজে আসে তাদের জন্য আমাদের সহযোগিতা থাকে। এখন প্রয়োজন ঐতিহ্যবাহি এই বাড়িটি সংরক্ষণ।
জমিদার বাড়ির আমির হোসেন। চান্দ্রা উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে। হোসেন বলেন, জানতে পেরেছি আমাদের পূর্ব পুরুষরা জমিদার ছিলেন। এটি জেনে আমার কাছে খুবই ভালো লাগে। অনেকেই আমাদের বাড়ি দেখতে আসেন।
এই বাড়িতে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী এমরান হোসেন বলেন, শহর থেকে বাড়িটে দেখার জন্য এসেছি। পুরো বাড়ি ঘুরে আমার খুবই ভালো লেগেছে। বিশেষ করে পুরনো ভবনগুলো নকশা করা খুবই চমৎকার। তবে এই বাড়িটি সংরক্ষণ করা দরকার। আর না হয় জমিদারদের স্মৃতিগুলো হারিয়ে যাবে।
ওই বাড়ির সামনে থাকা হরিপুর নেছারিয়া ডিগ্রি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নুর মোহাম্মদ খান বলেন, জমিদার বাড়ির লোকজনের কারণে এলাকার বহু মানুষ উপকৃত। তাদের মধ্যে অনেকেই ধার্মিক ছিলেন এবং মাদ্রাসায় উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন।
মাদ্রাসার শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, শুধুমাত্র মাদ্রাসাই নয়, এখানে এতিমখানা, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন জমিদার বংশের লোকেরা। এখনো তারা সামাজিক কাজে সহযোগিতা করেন।
চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম.এন জামিউল হিকমা বলেন, হরিপুর চৌধুরী বাড়ির লোকজন জমিদার ছিলেন এবং বাড়িটি খুইব সুন্দর জেনেছি। শুনেছি সিনেমার সুটিং হয়েছে। কিন্তু আমার যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে এই বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হবে।