Dhaka , Monday, 16 March 2026

তিস্তায় অর্ধশতাধিক বোমা মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদীতে অবৈধ পাথর উত্তোলন কোনোভাবেই থামছে না।
প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীর অভ্যন্তরে গভীর খাদ তৈরি করে পাথর উত্তোলন করে আসছে। জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তর ‘ম্যানেজ’ করেই এ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে—এমন দাবিও করছেন পাথর উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতরা। ফলে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের ঘোষণার পরও বন্ধ হচ্ছে না এই অবৈধ বাণিজ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মাঝে প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হলেও তা অনেকটাই ‘লোকদেখানো’ বলে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। বরং অভিযানের পর উল্টো বাড়ছে পাথর উত্তোলনে ব্যবহৃত বোমা মেশিনের সংখ্যা। বর্তমানে তিস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে অর্ধশতাধিক বোমা মেশিন দিয়ে নদীর গভীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, তেলীর বাজার, তিস্তা বাজার, চরখড়িবাড়ি ও দোহলপাড়া এলাকায় তিস্তা নদীর অন্তত চারটি পয়েন্টে গভীর খাদ তৈরি করে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। মাত্র এক মাস আগেও যেখানে ১৫ থেকে ২০টি বোমা মেশিন সক্রিয় ছিল, সেখানে গত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দেখা গেছে অর্ধশতাধিক মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন চলছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের অভিযান শুরু হওয়ার আগেই পাথর উত্তোলনকারী চক্র খবর পেয়ে যায়। ফলে তারা মেশিন, পাইপসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখে। এতে অভিযান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার শুরু হয় নদীর তলদেশে গভীর খাদ থেকে পাথর উত্তোলনের মহোৎসব। এ কারণে এসব অভিযানকে অনেকেই ‘দায় এড়ানোর চেষ্টা’ বলেই মনে করছেন।
তিস্তা নদীতে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধের দায়িত্ব মূলত কার—উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—এ নিয়ে চলছে দায় এড়ানোর প্রবণতা। সংশ্লিষ্ট তিনটি দপ্তরের কেউই স্পষ্টভাবে দায়িত্ব নিতে চাইছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “সরকারের সব দপ্তরকে একযোগে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। প্রয়োজন হলে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে, তিস্তা নদী হতে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে আমি পিছপা হবো না।” ইনশাআল্লাহ।
তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে এখনো সেই কঠোরতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে তিস্তা নদীর ভাঙন দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত বর্ষা মৌসুমে ডিমলা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৬টিতে তীব্র নদীভাঙন দেখা দেয়। খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ছোটখাতা সুপারিটরি গ্রামে শত শত একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে নতুন চ্যানেলের সৃষ্টি হয়েছে। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
ভাঙন রোধে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে সিসি ব্লক ও বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে তীররক্ষা কাজ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নদীর অভ্যন্তরে গভীর খাদ তৈরি করে পাথর উত্তোলন অব্যাহত থাকলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রতি বছর নদীভাঙন রোধে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এসব প্রকল্পও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এমনকি সংরক্ষিত এলাকায় উত্তোলিত পাথর স্তূপ করে রাখার সুযোগ দিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল পরোক্ষভাবে এই অবৈধ বাণিজ্যকে সহায়তা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তিস্তা পাড়ের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, কথার আশ্বাস নয়—অবিলম্বে সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ ক্ষমতায় মামলা করে তাদের আইনের আওতায় আনা হলে তবেই তিস্তার গভীর তলদেশ থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব হবে।
নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো তিস্তা পাড়ের মানুষগুলো আবারও সরকারের সর্বোচ্চ মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

আলোচিত

তিস্তায় অর্ধশতাধিক বোমা মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন

প্রকাশ : 03:31 pm, Saturday, 14 March 2026

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদীতে অবৈধ পাথর উত্তোলন কোনোভাবেই থামছে না।
প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীর অভ্যন্তরে গভীর খাদ তৈরি করে পাথর উত্তোলন করে আসছে। জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তর ‘ম্যানেজ’ করেই এ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে—এমন দাবিও করছেন পাথর উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতরা। ফলে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের ঘোষণার পরও বন্ধ হচ্ছে না এই অবৈধ বাণিজ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মাঝে প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হলেও তা অনেকটাই ‘লোকদেখানো’ বলে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। বরং অভিযানের পর উল্টো বাড়ছে পাথর উত্তোলনে ব্যবহৃত বোমা মেশিনের সংখ্যা। বর্তমানে তিস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে অর্ধশতাধিক বোমা মেশিন দিয়ে নদীর গভীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, তেলীর বাজার, তিস্তা বাজার, চরখড়িবাড়ি ও দোহলপাড়া এলাকায় তিস্তা নদীর অন্তত চারটি পয়েন্টে গভীর খাদ তৈরি করে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। মাত্র এক মাস আগেও যেখানে ১৫ থেকে ২০টি বোমা মেশিন সক্রিয় ছিল, সেখানে গত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দেখা গেছে অর্ধশতাধিক মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন চলছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের অভিযান শুরু হওয়ার আগেই পাথর উত্তোলনকারী চক্র খবর পেয়ে যায়। ফলে তারা মেশিন, পাইপসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখে। এতে অভিযান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার শুরু হয় নদীর তলদেশে গভীর খাদ থেকে পাথর উত্তোলনের মহোৎসব। এ কারণে এসব অভিযানকে অনেকেই ‘দায় এড়ানোর চেষ্টা’ বলেই মনে করছেন।
তিস্তা নদীতে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধের দায়িত্ব মূলত কার—উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—এ নিয়ে চলছে দায় এড়ানোর প্রবণতা। সংশ্লিষ্ট তিনটি দপ্তরের কেউই স্পষ্টভাবে দায়িত্ব নিতে চাইছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “সরকারের সব দপ্তরকে একযোগে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। প্রয়োজন হলে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে, তিস্তা নদী হতে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে আমি পিছপা হবো না।” ইনশাআল্লাহ।
তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে এখনো সেই কঠোরতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে তিস্তা নদীর ভাঙন দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত বর্ষা মৌসুমে ডিমলা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৬টিতে তীব্র নদীভাঙন দেখা দেয়। খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ছোটখাতা সুপারিটরি গ্রামে শত শত একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে নতুন চ্যানেলের সৃষ্টি হয়েছে। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
ভাঙন রোধে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে সিসি ব্লক ও বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে তীররক্ষা কাজ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নদীর অভ্যন্তরে গভীর খাদ তৈরি করে পাথর উত্তোলন অব্যাহত থাকলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রতি বছর নদীভাঙন রোধে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এসব প্রকল্পও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এমনকি সংরক্ষিত এলাকায় উত্তোলিত পাথর স্তূপ করে রাখার সুযোগ দিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল পরোক্ষভাবে এই অবৈধ বাণিজ্যকে সহায়তা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তিস্তা পাড়ের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, কথার আশ্বাস নয়—অবিলম্বে সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ ক্ষমতায় মামলা করে তাদের আইনের আওতায় আনা হলে তবেই তিস্তার গভীর তলদেশ থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব হবে।
নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো তিস্তা পাড়ের মানুষগুলো আবারও সরকারের সর্বোচ্চ মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।