Dhaka , Monday, 16 March 2026

সিংগাইরে লিখিত অভিযোগ দিয়ে ফসলী জমি রক্ষা হচ্ছে না

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা বায়রা ইউনিয়নে মাটি দস্যুদের তান্ডবে বিপন্ন হয়ে পড়ছে তিন ফসলি কৃষিজমি। স্থানীয় প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা এবং এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে রাতের আঁধারে ভেকু ও হাইড্রোলিক ট্রাক দিয়ে কেটে নেওয়া হচ্ছে শত শত বিঘা জমির উর্বর উপরিভাগ মাটি (টপ সয়েল),অলরেডি বলধারা ইউনিয়নের খোলাপাড়ার চকে তিন ফ্যাসিলি কৃষি জমি বিলীন হয়ে গেছে। এতে একদিকে যেমন কৃষকেরা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন, অন্যদিকে জাতীয়ভাবে খাদ্য উৎপাদন ঘাটতির চরম ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায় বায়রা ইউনিয়নের কাচিগারা ও দামরা মাথাভাংগার চকে গিয়ে দেখা যায়, এক সময়ের সবুজ চকের বুক জুড়ে এখন শুধুই ধ্বংসযজ্ঞ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক ইউ পি সদস্য দুর্ধর্ষ ভূমিধস্যু বদু মেম্বার ও টুকাই মেম্বারের নাতি সহ প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকা থেকে মাটি লুটে জড়িত।
রাত দশটা বাজলেই ভোর পর্যন্ত চলে তিন ফসলি কৃষি জমে মাটি কাটার তাণ্ডব ও মাটি পরিবহনের কাজ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষকরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই চকে আগে ধান, পাট, ভুট্টা আর সরিষার বাম্পার ফলন হতো। এখন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আমাদের চোখের সামনে জমিগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে।’
কৃষিবিদদের মতে, জমির ওপরের স্তর বা ‘টপ সয়েল’ কেটে নিলে সেই জমির উর্বরতা ফিরে পেতে কয়েক দশক সময় লাগে। মানিকগঞ্জের এই বিশাল এলাকা থেকে মাটি সল্টিং করার ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ফসল উৎপাদন তলানিতে চলে গেছে।
কৃষকরা বলেন, এভাবে মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এলাকায় তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেবে এবং জাতীয় কৃষি অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মাটি কাটার প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক কৃষককে এলাকা ছাড়া হতে হয়েছে।বিশেষ করে খোলাপাড়া চকে কৃষি জমির মাটিকাটা বাধা দিলে, এক বাধা দানকারীর দুই বিঘা তিন ফসলি কৃষি জমি কুদ্দুস কোম্পানি জোর করে রাতের আঁধারে ভেকু দিয়ে কেটে ডোবায় পরিণত করলে ও , সিংগাইর উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে নি। শুধু তাই নয় এই কুদ্দুস কোম্পানি ও তার ভাইয়েরা খোলাপাড়া চক দিয়ে বয়ে যাওয়া সরকারি রাস্তা কেটে মাটি বিক্রি করার ফলে, সরকারি রাস্তা বিলীন হলেও নীরবতা পালন করছেন উপজেলা প্রশাসন,এমনটাই দাবি করেন ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সাধারণ কৃষকরা। ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আর ও এক কৃষক সাংবাদিকদের বলেন, গত বছর আমার জমির আইল সহ কিছু জমি কেটে নিয়ে যাওয়ার বিষয় আপনাদেরকে জানানোর পর, রাতের আঁধারে জোর করে আমার প্রায় দুই বিঘা তিন ফসলি কৃষি জমি কেটে নিয়ে গেছেন কুদ্দুস কোম্পানি।
এদিকে ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। স্থানীয়দের দাবি, মাটি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান সংশ্লিষ্টরা। বায়রা ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা বলেন আমরা নিরুপায়।
তিন ফসলী কৃষিজমি মাটিকাটা বন্ধের জন্য বায়রা ইউনিয়ন সাধারণ জনগণের পক্ষে, মানিকগঞ্জ মডেল স্কুলের শিক্ষক মোঃ শরিফুল ইসলাম বাদী হয়ে,মাটি ব্যবসায়ী১/ জুয়েল,পিতা আবুল হোসেন , ২/রবিউল পিতা সুরুজ মিয়া ৩/রুবেল পিতা রাহেজ উদ্দিন, ৪/পলাশ, পিতা সেলিম নেতা ৫/দুর্ধর্ষ মাটি ব্যবসায়ী বদু মেম্বার সহ অজ্ঞাত বেশ কয়েকজনের নামে সিংগাইর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি এসিল্যান্ড বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পর মাটি কাটার তান্ডব এখন মহাতান্ডবে পরিণত হয়েছে ।
সিংগাইর এসিল্যান্ড বরাবর লিখিত অভিযোগকারী বলেন, সিংগাইর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি এসিল্যান্ড মোঃ হাবেল উদ্দিন অভিযোগ পেয়ে, তিন ফসলি কৃষি জমি মাটি কাটা বন্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললে ও, তিন ফসলি কৃষি জমির মাটিকাটা ধ্বংসযজ্ঞ তান্ডব থেকে মহাতান্ডবে রুপ ধারন করেছে।
সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউ এন ও) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বলেন,বিষয়টি আমি দেখব।
অবৈধ মাটিকাটা বন্ধের বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুন আরা সুলতানা কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মাটি কাটা বন্ধে আমরা বদ্ধপরিকর। নির্দিষ্ট লোকেশন ও তথ্য পেলে দ্রুততম সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে প্রশাসনের এই আশ্বাসে কতটা স্বস্তি ফিরবে, তা নিয়ে সন্দিহান এলাকাবাসী। তাদের দাবি, দ্রুত এই ‘মাটি দস্যু’ চক্রকে দমন না করলে মানিকগঞ্জের মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে উর্বর তিন ফসলি কৃষিজমি।

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

আলোচিত

সিংগাইরে লিখিত অভিযোগ দিয়ে ফসলী জমি রক্ষা হচ্ছে না

প্রকাশ : 14 Hours Ago

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা বায়রা ইউনিয়নে মাটি দস্যুদের তান্ডবে বিপন্ন হয়ে পড়ছে তিন ফসলি কৃষিজমি। স্থানীয় প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা এবং এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে রাতের আঁধারে ভেকু ও হাইড্রোলিক ট্রাক দিয়ে কেটে নেওয়া হচ্ছে শত শত বিঘা জমির উর্বর উপরিভাগ মাটি (টপ সয়েল),অলরেডি বলধারা ইউনিয়নের খোলাপাড়ার চকে তিন ফ্যাসিলি কৃষি জমি বিলীন হয়ে গেছে। এতে একদিকে যেমন কৃষকেরা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন, অন্যদিকে জাতীয়ভাবে খাদ্য উৎপাদন ঘাটতির চরম ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায় বায়রা ইউনিয়নের কাচিগারা ও দামরা মাথাভাংগার চকে গিয়ে দেখা যায়, এক সময়ের সবুজ চকের বুক জুড়ে এখন শুধুই ধ্বংসযজ্ঞ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক ইউ পি সদস্য দুর্ধর্ষ ভূমিধস্যু বদু মেম্বার ও টুকাই মেম্বারের নাতি সহ প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকা থেকে মাটি লুটে জড়িত।
রাত দশটা বাজলেই ভোর পর্যন্ত চলে তিন ফসলি কৃষি জমে মাটি কাটার তাণ্ডব ও মাটি পরিবহনের কাজ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষকরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই চকে আগে ধান, পাট, ভুট্টা আর সরিষার বাম্পার ফলন হতো। এখন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আমাদের চোখের সামনে জমিগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে।’
কৃষিবিদদের মতে, জমির ওপরের স্তর বা ‘টপ সয়েল’ কেটে নিলে সেই জমির উর্বরতা ফিরে পেতে কয়েক দশক সময় লাগে। মানিকগঞ্জের এই বিশাল এলাকা থেকে মাটি সল্টিং করার ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ফসল উৎপাদন তলানিতে চলে গেছে।
কৃষকরা বলেন, এভাবে মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এলাকায় তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেবে এবং জাতীয় কৃষি অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মাটি কাটার প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক কৃষককে এলাকা ছাড়া হতে হয়েছে।বিশেষ করে খোলাপাড়া চকে কৃষি জমির মাটিকাটা বাধা দিলে, এক বাধা দানকারীর দুই বিঘা তিন ফসলি কৃষি জমি কুদ্দুস কোম্পানি জোর করে রাতের আঁধারে ভেকু দিয়ে কেটে ডোবায় পরিণত করলে ও , সিংগাইর উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে নি। শুধু তাই নয় এই কুদ্দুস কোম্পানি ও তার ভাইয়েরা খোলাপাড়া চক দিয়ে বয়ে যাওয়া সরকারি রাস্তা কেটে মাটি বিক্রি করার ফলে, সরকারি রাস্তা বিলীন হলেও নীরবতা পালন করছেন উপজেলা প্রশাসন,এমনটাই দাবি করেন ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সাধারণ কৃষকরা। ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আর ও এক কৃষক সাংবাদিকদের বলেন, গত বছর আমার জমির আইল সহ কিছু জমি কেটে নিয়ে যাওয়ার বিষয় আপনাদেরকে জানানোর পর, রাতের আঁধারে জোর করে আমার প্রায় দুই বিঘা তিন ফসলি কৃষি জমি কেটে নিয়ে গেছেন কুদ্দুস কোম্পানি।
এদিকে ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। স্থানীয়দের দাবি, মাটি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান সংশ্লিষ্টরা। বায়রা ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা বলেন আমরা নিরুপায়।
তিন ফসলী কৃষিজমি মাটিকাটা বন্ধের জন্য বায়রা ইউনিয়ন সাধারণ জনগণের পক্ষে, মানিকগঞ্জ মডেল স্কুলের শিক্ষক মোঃ শরিফুল ইসলাম বাদী হয়ে,মাটি ব্যবসায়ী১/ জুয়েল,পিতা আবুল হোসেন , ২/রবিউল পিতা সুরুজ মিয়া ৩/রুবেল পিতা রাহেজ উদ্দিন, ৪/পলাশ, পিতা সেলিম নেতা ৫/দুর্ধর্ষ মাটি ব্যবসায়ী বদু মেম্বার সহ অজ্ঞাত বেশ কয়েকজনের নামে সিংগাইর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি এসিল্যান্ড বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পর মাটি কাটার তান্ডব এখন মহাতান্ডবে পরিণত হয়েছে ।
সিংগাইর এসিল্যান্ড বরাবর লিখিত অভিযোগকারী বলেন, সিংগাইর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি এসিল্যান্ড মোঃ হাবেল উদ্দিন অভিযোগ পেয়ে, তিন ফসলি কৃষি জমি মাটি কাটা বন্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললে ও, তিন ফসলি কৃষি জমির মাটিকাটা ধ্বংসযজ্ঞ তান্ডব থেকে মহাতান্ডবে রুপ ধারন করেছে।
সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউ এন ও) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বলেন,বিষয়টি আমি দেখব।
অবৈধ মাটিকাটা বন্ধের বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুন আরা সুলতানা কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মাটি কাটা বন্ধে আমরা বদ্ধপরিকর। নির্দিষ্ট লোকেশন ও তথ্য পেলে দ্রুততম সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে প্রশাসনের এই আশ্বাসে কতটা স্বস্তি ফিরবে, তা নিয়ে সন্দিহান এলাকাবাসী। তাদের দাবি, দ্রুত এই ‘মাটি দস্যু’ চক্রকে দমন না করলে মানিকগঞ্জের মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে উর্বর তিন ফসলি কৃষিজমি।