দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬-এর নিরাপত্তা নিয়ে পরিচালিত কারিগরি নিরীক্ষায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর গঠিত কারিগরি নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির মূল্যায়নে মোট ৯টি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির ক্ষেত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বেয়ারিং প্যাডের বিকৃতি ও স্থানচ্যুতি, পিয়ার ও বক্স গার্ডারে ফাটল, ট্র্যাক ও ভূমি বসে যাওয়া, অতিরিক্ত কম্পন, ট্রেনের অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি।
নিরীক্ষা কমিটির পর্যবেক্ষণে এসব বিষয়কে কেবল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটি হিসেবে দেখা হয়নি। বরং মেট্রোরেলের নকশা যাচাই, নির্মাণের মান নিয়ন্ত্রণ, তৃতীয় পক্ষের কারিগরি পরীক্ষা, গতিশীল সক্ষমতা যাচাই এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় ঘাটতির বিষয়ও সামনে এসেছে।
কমিটি কয়েকটি ক্ষেত্রে দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি যাচাইয়ের সুপারিশ করেছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো বেয়ারিং প্যাড। মেট্রোরেল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএলের একটি সভার রেকর্ড অনুযায়ী, ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ বেয়ারিং প্যাডে ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে এবং এসবের দ্রুত পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।
কমিটির চিহ্নিত ঝুঁকির মধ্যে বেয়ারিং প্যাডের বিকৃতি ও অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টিও রয়েছে। বিশেষ করে ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাড অনুমোদিত সীমার তুলনায় বেশি বিকৃত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে।
এ ধরনের উপাদান মেট্রোরেলের উড়াল কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এগুলোর অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিস্থাপনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে এমআরটি লাইন-৬-এর কয়েকটি অংশে সাময়িকভাবে ট্রেনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত মূল লাইনের ১০টি স্থানে সাময়িক গতিসীমা কার্যকর ছিল।
নকশা অনুযায়ী মেট্রোরেলের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হলেও এসব অংশে তা কমিয়ে ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবে নির্ধারিত সীমার চেয়েও ঘণ্টায় প্রায় ১৩ থেকে ১৬ কিলোমিটার কম গতিতে ট্রেন পরিচালিত হচ্ছে।
সাময়িকভাবে গতি কমানো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও এর মাধ্যমে সমস্যার মূল কারণ দূর করা যায় না।
নিরীক্ষায় পিয়ার, কংক্রিট বেস ও বক্স গার্ডারে ফাটলের বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ডিপো ও ট্র্যাকের ভিত্তি বসে যাওয়া, কম্পন এবং গতিশীল কার্যক্ষমতার ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রেনের অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি ও চাকার ক্ষয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ ধরনের সমস্যার কারণে পাঁচটি ট্রেন সেট যাত্রী পরিবহন থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া নির্ধারিত স্থানের আগেই ট্রেন থেমে যাওয়ার ঘটনাকে নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
কারিগরি পর্যবেক্ষণে মেট্রোরেলের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার কয়েকটি বিষয়ও উঠে এসেছে। এর মধ্যে ট্রান্সফরমারের ত্রুটি, গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক কক্ষে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার সমস্যা, স্পার্কিং এবং ১৬টি স্টেশনের বৈদ্যুতিক ও সিগন্যালিং কক্ষে পানি প্রবেশের বিষয় রয়েছে।
কমিটির মতে, এসব সমস্যা বিদ্যুৎ সরবরাহ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কমিটির পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের বিস্তারিত কাঠামোগত নকশা, মডেল সিমুলেশন, ডিজাইন ক্যালকুলেশন এবং ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমের স্বাধীন তৃতীয় পক্ষীয় যাচাইয়ের পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ট্রেনের কম্পন, অনুরণন, কাঠামোগত ক্লান্তি এবং চলন্ত ট্রেনের ভারের প্রভাব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গতিশীল বিশ্লেষণেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কমিটি জানিয়েছে, তাদের পক্ষে পুরো রুটের ট্র্যাক-জ্যামিতি জরিপ, পূর্ণাঙ্গ গতিশীল পরীক্ষা, স্বাধীন ভূ-প্রকৌশলগত অনুসন্ধান এবং পুরো ভায়াডাক্টের বিস্তারিত কাঠামোগত মডেলিং করা সম্ভব হয়নি। এজন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
মেট্রোরেলের নিরাপত্তা নিয়ে এই বিশেষ নিরীক্ষার পেছনে রয়েছে একটি গুরুতর ঘটনা। ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের কাছে ৪৩৩ নম্বর পিয়ার থেকে একটি বেয়ারিং প্যাড পড়ে একজন নিহত এবং আরও দুজন আহত হন।
এর আগে কাছাকাছি এলাকায় একই ধরনের আরেকটি বেয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে একাধিক রিটের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে পুরো এমআরটি লাইন-৬-এর নিরাপত্তা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রায় ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রোরেল লাইনে রয়েছে ১৬টি উড়াল স্টেশন। প্রতিদিন প্রায় চার লাখ যাত্রী এই পরিবহনব্যবস্থা ব্যবহার করেন।
কারিগরি কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমটিসিএল। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, ৪২৩, ৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮ নম্বর পিয়ারে মোট ১০টি স্টিল ব্র্যাকেট বসানো হয়েছে।
এ ছাড়া বেয়ারিং প্যাড পরিবর্তন, পিয়ার হেডে সেটেলমেন্ট মার্কার ও ক্র্যাক গেজ স্থাপনের কাজ চলছে। পুরো কাঠামোর বিভিন্ন অংশে ১০২টি ক্র্যাক গেজ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পিয়ার ও বক্স গার্ডারের ফাটলের স্থায়ী সমাধানে বুয়েটকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্পার্কিং ও স্টেশনে পানি প্রবেশের সমস্যাও সমাধানের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
২০২২ সালে অনুমোদিত দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী মেট্রোরেলের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। কমলাপুর সম্প্রসারণসহ প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। সে হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা।
২০১৬ সালের ২৬ জুন মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশে যাত্রী চলাচল শুরু হয় ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর। পরবর্তী সময়ে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশে ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর যাত্রী পরিবহন শুরু হয়।
কারিগরি কমিটির চূড়ান্ত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এমআরটি লাইন-৬ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন অবকাঠামো। তাই চিহ্নিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান, প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার, ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাড পরিবর্তন এবং স্বাধীন নিরাপত্তা যাচাইকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
.png)
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬-এর নিরাপত্তা নিয়ে পরিচালিত কারিগরি নিরীক্ষায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর গঠিত কারিগরি নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির মূল্যায়নে মোট ৯টি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির ক্ষেত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বেয়ারিং প্যাডের বিকৃতি ও স্থানচ্যুতি, পিয়ার ও বক্স গার্ডারে ফাটল, ট্র্যাক ও ভূমি বসে যাওয়া, অতিরিক্ত কম্পন, ট্রেনের অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি।
নিরীক্ষা কমিটির পর্যবেক্ষণে এসব বিষয়কে কেবল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটি হিসেবে দেখা হয়নি। বরং মেট্রোরেলের নকশা যাচাই, নির্মাণের মান নিয়ন্ত্রণ, তৃতীয় পক্ষের কারিগরি পরীক্ষা, গতিশীল সক্ষমতা যাচাই এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় ঘাটতির বিষয়ও সামনে এসেছে।
কমিটি কয়েকটি ক্ষেত্রে দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি যাচাইয়ের সুপারিশ করেছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো বেয়ারিং প্যাড। মেট্রোরেল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএলের একটি সভার রেকর্ড অনুযায়ী, ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ বেয়ারিং প্যাডে ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে এবং এসবের দ্রুত পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।
কমিটির চিহ্নিত ঝুঁকির মধ্যে বেয়ারিং প্যাডের বিকৃতি ও অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টিও রয়েছে। বিশেষ করে ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাড অনুমোদিত সীমার তুলনায় বেশি বিকৃত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে।
এ ধরনের উপাদান মেট্রোরেলের উড়াল কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এগুলোর অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিস্থাপনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে এমআরটি লাইন-৬-এর কয়েকটি অংশে সাময়িকভাবে ট্রেনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত মূল লাইনের ১০টি স্থানে সাময়িক গতিসীমা কার্যকর ছিল।
নকশা অনুযায়ী মেট্রোরেলের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হলেও এসব অংশে তা কমিয়ে ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবে নির্ধারিত সীমার চেয়েও ঘণ্টায় প্রায় ১৩ থেকে ১৬ কিলোমিটার কম গতিতে ট্রেন পরিচালিত হচ্ছে।
সাময়িকভাবে গতি কমানো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও এর মাধ্যমে সমস্যার মূল কারণ দূর করা যায় না।
নিরীক্ষায় পিয়ার, কংক্রিট বেস ও বক্স গার্ডারে ফাটলের বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ডিপো ও ট্র্যাকের ভিত্তি বসে যাওয়া, কম্পন এবং গতিশীল কার্যক্ষমতার ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রেনের অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি ও চাকার ক্ষয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ ধরনের সমস্যার কারণে পাঁচটি ট্রেন সেট যাত্রী পরিবহন থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া নির্ধারিত স্থানের আগেই ট্রেন থেমে যাওয়ার ঘটনাকে নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
কারিগরি পর্যবেক্ষণে মেট্রোরেলের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার কয়েকটি বিষয়ও উঠে এসেছে। এর মধ্যে ট্রান্সফরমারের ত্রুটি, গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক কক্ষে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার সমস্যা, স্পার্কিং এবং ১৬টি স্টেশনের বৈদ্যুতিক ও সিগন্যালিং কক্ষে পানি প্রবেশের বিষয় রয়েছে।
কমিটির মতে, এসব সমস্যা বিদ্যুৎ সরবরাহ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কমিটির পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের বিস্তারিত কাঠামোগত নকশা, মডেল সিমুলেশন, ডিজাইন ক্যালকুলেশন এবং ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমের স্বাধীন তৃতীয় পক্ষীয় যাচাইয়ের পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ট্রেনের কম্পন, অনুরণন, কাঠামোগত ক্লান্তি এবং চলন্ত ট্রেনের ভারের প্রভাব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গতিশীল বিশ্লেষণেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কমিটি জানিয়েছে, তাদের পক্ষে পুরো রুটের ট্র্যাক-জ্যামিতি জরিপ, পূর্ণাঙ্গ গতিশীল পরীক্ষা, স্বাধীন ভূ-প্রকৌশলগত অনুসন্ধান এবং পুরো ভায়াডাক্টের বিস্তারিত কাঠামোগত মডেলিং করা সম্ভব হয়নি। এজন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
মেট্রোরেলের নিরাপত্তা নিয়ে এই বিশেষ নিরীক্ষার পেছনে রয়েছে একটি গুরুতর ঘটনা। ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের কাছে ৪৩৩ নম্বর পিয়ার থেকে একটি বেয়ারিং প্যাড পড়ে একজন নিহত এবং আরও দুজন আহত হন।
এর আগে কাছাকাছি এলাকায় একই ধরনের আরেকটি বেয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে একাধিক রিটের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে পুরো এমআরটি লাইন-৬-এর নিরাপত্তা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রায় ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রোরেল লাইনে রয়েছে ১৬টি উড়াল স্টেশন। প্রতিদিন প্রায় চার লাখ যাত্রী এই পরিবহনব্যবস্থা ব্যবহার করেন।
কারিগরি কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমটিসিএল। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, ৪২৩, ৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮ নম্বর পিয়ারে মোট ১০টি স্টিল ব্র্যাকেট বসানো হয়েছে।
এ ছাড়া বেয়ারিং প্যাড পরিবর্তন, পিয়ার হেডে সেটেলমেন্ট মার্কার ও ক্র্যাক গেজ স্থাপনের কাজ চলছে। পুরো কাঠামোর বিভিন্ন অংশে ১০২টি ক্র্যাক গেজ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পিয়ার ও বক্স গার্ডারের ফাটলের স্থায়ী সমাধানে বুয়েটকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্পার্কিং ও স্টেশনে পানি প্রবেশের সমস্যাও সমাধানের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
২০২২ সালে অনুমোদিত দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী মেট্রোরেলের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। কমলাপুর সম্প্রসারণসহ প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। সে হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা।
২০১৬ সালের ২৬ জুন মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশে যাত্রী চলাচল শুরু হয় ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর। পরবর্তী সময়ে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশে ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর যাত্রী পরিবহন শুরু হয়।
কারিগরি কমিটির চূড়ান্ত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এমআরটি লাইন-৬ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন অবকাঠামো। তাই চিহ্নিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান, প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার, ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাড পরিবর্তন এবং স্বাধীন নিরাপত্তা যাচাইকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
.png)
আপনার মতামত লিখুন