সরেজমিন নিউজ

দোলন ভৌমিকঃ একাই গড়ছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম



দোলন ভৌমিকঃ একাই গড়ছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিন্নাটি ইউনিয়নের কালটিয়া এলাকায় ছোট্ট একটি বিদ্যালয়—বিন্নাটি মিশু বিদ্যানিকেতন। অবকাঠামো বা শিক্ষকসংখ্যার বিচারে বিদ্যালয়টি হয়তো বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনীয় নয়। কিন্তু এই ছোট্ট বিদ্যালয়টিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একটি বড় গল্প। আর সেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজনই—শিক্ষিকা দোলন ভৌমিক

৩২ বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে একাই পাঠদান করে আসছেন তিনি। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞানসহ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে ক্লাস নেন নিজেই। শুধু শিক্ষকতা নয়, বিদ্যালয়ের ঘর ঝাড়ু দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় দিয়ে পড়ানো—প্রায় সব দায়িত্বই তাঁর কাঁধে।

সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান চলে। কোনো বিষয়ে আলাদা শিক্ষক নেই। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যেন ঘাটতি না থাকে, সে জন্য নির্ধারিত সময়ের বাইরেও প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের সময় দেন দোলন। তাঁর লক্ষ্য, বিদ্যালয়ের পড়া যেন বিদ্যালয়েই ভালোভাবে শেষ হয় এবং শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে না হয়।

শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন মাত্র ২০০ টাকা। অনেক পরিবারের পক্ষেও এই সামান্য অর্থ জোগানো কঠিন হওয়ায় কয়েকজন শিক্ষার্থী বিনা বেতনেও পড়াশোনা করে।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ বিদ্যালয়ের ঘর ভাড়া ও মিশু শিক্ষা কার্যক্রমের প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে চলে যায়। এসব খরচ পরিশোধের পর দোলন ভৌমিকের হাতে মাসিক সম্মানী হিসেবে থাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা।

১৯৯৪ সালে মাত্র ৮০০ টাকা বেতন দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু। সেই শুরু থেকে ৩২ বছর ধরে একই নিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

দোলন ভৌমিকের জন্ম ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বহেরাতুল গ্রামে। তাঁর সময়ে ওই গ্রাম থেকে মাত্র তিনজন এসএসসি পাস করেছিলেন—দুজন ছেলে ও একজন মেয়ে। সেই একমাত্র মেয়েটি ছিলেন দোলন।

ছোটবেলা থেকেই উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। কিন্তু এসএসসি পাস করার পর পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তাঁকে কিশোরগঞ্জে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পরও শিক্ষাজীবন ও শিক্ষকতার স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ইন্টারভিউ দিয়েও সে সুযোগ পাননি। তবে ব্যর্থ হয়ে থেমে না গিয়ে অন্য পথ খুঁজেছেন। পরে ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর শিক্ষকতা জীবনের নতুন অধ্যায়।

এরপর ধীরে ধীরে বিন্নাটি মিশু বিদ্যানিকেতন হয়ে ওঠে তাঁর কর্মজীবনের স্থায়ী ঠিকানা।

দোলন ভৌমিকের একার হাতে পরিচালিত এই বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় শিক্ষার্থীদের ফলাফল। প্রতিবছরই সমাপনী পরীক্ষায় ভালো ফল এবং জিপিএ-৫ অর্জনের পাশাপাশি বৃত্তিতেও সাফল্য পেয়ে আসছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

সর্বশেষ বৃত্তির ফলাফলও সেই ধারাবাহিকতারই প্রমাণ। ২০২৪ সালে পঞ্চম শ্রেণির ১৪ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১৪ জনই বৃত্তি লাভ করে। তাঁদের মধ্যে ট্যালেন্টপুল বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীও ছিল।

এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে ১৪ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৮ জন বৃত্তি অর্জন করে। এর পাশাপাশি সমাপনী পরীক্ষাতেও বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে সর্বাধিক সংখ্যক জিপিএ-৫সহ ভালো ফল করে আসছে।

একজন শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত একটি ছোট বিদ্যালয়ের জন্য এমন ধারাবাহিক ফলাফলই যেন দোলন ভৌমিকের দীর্ঘ শ্রমের সবচেয়ে দৃশ্যমান স্বীকৃতি।

বিন্নাটি মিশু বিদ্যানিকেতনের সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখন দেশের বিভিন্ন নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন। কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ মেডিকেল কলেজে, কেউ বিসিএস ক্যাডার হিসেবে কর্মরত। আবার কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

তাঁদের অনেকেই এখনো সময়-সুযোগ পেলে ফিরে আসেন তাঁদের শৈশবের বিদ্যালয়ে। দেখা করেন প্রিয় শিক্ষিকার সঙ্গে, কথা বলেন, খোঁজখবর নেন।

সাবেক শিক্ষার্থীদের সাফল্যের কথা শুনলে দোলন ভৌমিকের মুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সঞ্চয় হিসেবে তিনি যেন নিজের হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের সাফল্যকেই সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন।

স্থানীয় অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দোলন ভৌমিকের প্রতি তাঁদের আস্থা দীর্ঘদিনের। তাঁদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন; অনেকটা পরিবারের সদস্যের মতো।

অভিভাবকদের ভাষ্য, এই এলাকার বহু শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের প্রথম ভিত্তি তৈরি হয়েছে বিন্নাটি মিশু বিদ্যানিকেতনে। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই অনেকে পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছেছেন।

তাঁদের বিশ্বাস, শিক্ষার্থীদের এই পথচলার শুরুতে দোলন ভৌমিকের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনে বয়স ও পারিবারিক বাস্তবতার কারণে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে এখন অবসর নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু দোলন ভৌমিক এখনো নিজের সিদ্ধান্তে অটল।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসুস্থতা কিংবা নানা প্রতিকূলতা—কোনো কিছুই তাঁকে দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দূরে রাখতে পারেনি। তাঁর কাছে বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীরা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

তিনি মনে করেন, যতদিন শারীরিকভাবে সামর্থ্য আছে, ততদিন শিশুদের পড়িয়ে যেতে চান। তাঁর উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করানো নয়; শিক্ষার্থীদের সৎ, যোগ্য ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

সরকার বা রাষ্ট্রের কাছে তাঁর কোনো বিশেষ দাবি আছে কি না—জানতে চাইলে দোলন ভৌমিকের উত্তর খুবই সরল।

শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা এবং গ্রামবাসীর কাছ থেকে পাওয়া সম্মানই তাঁর কাছে যথেষ্ট। অর্থনৈতিক সাফল্য হয়তো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের বড় প্রাপ্তি নয়; কিন্তু তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের সাফল্য তাঁকে যে তৃপ্তি দেয়, সেটিই তাঁর কাছে বড় অর্জন।

অভিভাবকদের বিশ্বাসের জায়গাটি ধরে রেখে শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি।

একটি বিদ্যালয় পরিচালনায় যেখানে একাধিক শিক্ষক, কর্মচারী ও নানা সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন, সেখানে একজন মানুষ ৩২ বছর ধরে প্রায় একাই সামলে যাচ্ছেন পুরো দায়িত্ব। বড় বেতন নেই, বড় অবকাঠামো নেই—আছে শুধু দায়িত্ববোধ, শিক্ষার্থীদের প্রতি মমতা এবং শিক্ষকতার প্রতি গভীর ভালোবাসা।

দোলন ভৌমিকের গল্প তাই শুধু একজন শিক্ষকের গল্প নয়। এটি একটি ছোট্ট বিদ্যালয়কে ঘিরে মানুষের আস্থা, ভালোবাসা, সংগ্রাম এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্বপ্ন গড়ে ওঠার গল্প।

আজ তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষার্থী, কেউ সরকারি চাকরিতে, কেউ দেশের সীমানা পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের সাফল্যের পেছনে অনেক মানুষের অবদান থাকলেও শৈশবের সেই প্রথম পাঠের শিক্ষককে তাঁরা ভুলে যাননি।

আর সেই প্রথম পাঠের শিক্ষক হিসেবে দোলন ভৌমিক আজও দাঁড়িয়ে আছেন বিন্নাটি মিশু বিদ্যানিকেতনে—সামান্য সম্মানীতে, অসামান্য দায়িত্ব নিয়ে।

৩২ বছর পেরিয়েও তাঁর শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিন আসে নতুন মুখ। নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে তুলতেই দোলন ভৌমিক যেন প্রতিদিন নতুন করে লিখে চলেছেন নিজের শিক্ষকতা জীবনের গল্প।

আপনার মতামত লিখুন

সরেজমিন নিউজ

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


দোলন ভৌমিকঃ একাই গড়ছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম

প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিন্নাটি ইউনিয়নের কালটিয়া এলাকায় ছোট্ট একটি বিদ্যালয়—বিন্নাটি মিশু বিদ্যানিকেতন। অবকাঠামো বা শিক্ষকসংখ্যার বিচারে বিদ্যালয়টি হয়তো বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনীয় নয়। কিন্তু এই ছোট্ট বিদ্যালয়টিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একটি বড় গল্প। আর সেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজনই—শিক্ষিকা দোলন ভৌমিক

৩২ বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে একাই পাঠদান করে আসছেন তিনি। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞানসহ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে ক্লাস নেন নিজেই। শুধু শিক্ষকতা নয়, বিদ্যালয়ের ঘর ঝাড়ু দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় দিয়ে পড়ানো—প্রায় সব দায়িত্বই তাঁর কাঁধে।

সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান চলে। কোনো বিষয়ে আলাদা শিক্ষক নেই। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যেন ঘাটতি না থাকে, সে জন্য নির্ধারিত সময়ের বাইরেও প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের সময় দেন দোলন। তাঁর লক্ষ্য, বিদ্যালয়ের পড়া যেন বিদ্যালয়েই ভালোভাবে শেষ হয় এবং শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে না হয়।

শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন মাত্র ২০০ টাকা। অনেক পরিবারের পক্ষেও এই সামান্য অর্থ জোগানো কঠিন হওয়ায় কয়েকজন শিক্ষার্থী বিনা বেতনেও পড়াশোনা করে।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ বিদ্যালয়ের ঘর ভাড়া ও মিশু শিক্ষা কার্যক্রমের প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে চলে যায়। এসব খরচ পরিশোধের পর দোলন ভৌমিকের হাতে মাসিক সম্মানী হিসেবে থাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা।

১৯৯৪ সালে মাত্র ৮০০ টাকা বেতন দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু। সেই শুরু থেকে ৩২ বছর ধরে একই নিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

দোলন ভৌমিকের জন্ম ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বহেরাতুল গ্রামে। তাঁর সময়ে ওই গ্রাম থেকে মাত্র তিনজন এসএসসি পাস করেছিলেন—দুজন ছেলে ও একজন মেয়ে। সেই একমাত্র মেয়েটি ছিলেন দোলন।

ছোটবেলা থেকেই উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। কিন্তু এসএসসি পাস করার পর পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তাঁকে কিশোরগঞ্জে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পরও শিক্ষাজীবন ও শিক্ষকতার স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ইন্টারভিউ দিয়েও সে সুযোগ পাননি। তবে ব্যর্থ হয়ে থেমে না গিয়ে অন্য পথ খুঁজেছেন। পরে ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর শিক্ষকতা জীবনের নতুন অধ্যায়।

এরপর ধীরে ধীরে বিন্নাটি মিশু বিদ্যানিকেতন হয়ে ওঠে তাঁর কর্মজীবনের স্থায়ী ঠিকানা।

দোলন ভৌমিকের একার হাতে পরিচালিত এই বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় শিক্ষার্থীদের ফলাফল। প্রতিবছরই সমাপনী পরীক্ষায় ভালো ফল এবং জিপিএ-৫ অর্জনের পাশাপাশি বৃত্তিতেও সাফল্য পেয়ে আসছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

সর্বশেষ বৃত্তির ফলাফলও সেই ধারাবাহিকতারই প্রমাণ। ২০২৪ সালে পঞ্চম শ্রেণির ১৪ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১৪ জনই বৃত্তি লাভ করে। তাঁদের মধ্যে ট্যালেন্টপুল বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীও ছিল।

এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে ১৪ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৮ জন বৃত্তি অর্জন করে। এর পাশাপাশি সমাপনী পরীক্ষাতেও বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে সর্বাধিক সংখ্যক জিপিএ-৫সহ ভালো ফল করে আসছে।

একজন শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত একটি ছোট বিদ্যালয়ের জন্য এমন ধারাবাহিক ফলাফলই যেন দোলন ভৌমিকের দীর্ঘ শ্রমের সবচেয়ে দৃশ্যমান স্বীকৃতি।

বিন্নাটি মিশু বিদ্যানিকেতনের সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখন দেশের বিভিন্ন নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন। কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ মেডিকেল কলেজে, কেউ বিসিএস ক্যাডার হিসেবে কর্মরত। আবার কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

তাঁদের অনেকেই এখনো সময়-সুযোগ পেলে ফিরে আসেন তাঁদের শৈশবের বিদ্যালয়ে। দেখা করেন প্রিয় শিক্ষিকার সঙ্গে, কথা বলেন, খোঁজখবর নেন।

সাবেক শিক্ষার্থীদের সাফল্যের কথা শুনলে দোলন ভৌমিকের মুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সঞ্চয় হিসেবে তিনি যেন নিজের হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের সাফল্যকেই সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন।

স্থানীয় অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দোলন ভৌমিকের প্রতি তাঁদের আস্থা দীর্ঘদিনের। তাঁদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন; অনেকটা পরিবারের সদস্যের মতো।

অভিভাবকদের ভাষ্য, এই এলাকার বহু শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের প্রথম ভিত্তি তৈরি হয়েছে বিন্নাটি মিশু বিদ্যানিকেতনে। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই অনেকে পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছেছেন।

তাঁদের বিশ্বাস, শিক্ষার্থীদের এই পথচলার শুরুতে দোলন ভৌমিকের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনে বয়স ও পারিবারিক বাস্তবতার কারণে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে এখন অবসর নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু দোলন ভৌমিক এখনো নিজের সিদ্ধান্তে অটল।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসুস্থতা কিংবা নানা প্রতিকূলতা—কোনো কিছুই তাঁকে দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দূরে রাখতে পারেনি। তাঁর কাছে বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীরা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

তিনি মনে করেন, যতদিন শারীরিকভাবে সামর্থ্য আছে, ততদিন শিশুদের পড়িয়ে যেতে চান। তাঁর উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করানো নয়; শিক্ষার্থীদের সৎ, যোগ্য ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

সরকার বা রাষ্ট্রের কাছে তাঁর কোনো বিশেষ দাবি আছে কি না—জানতে চাইলে দোলন ভৌমিকের উত্তর খুবই সরল।

শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা এবং গ্রামবাসীর কাছ থেকে পাওয়া সম্মানই তাঁর কাছে যথেষ্ট। অর্থনৈতিক সাফল্য হয়তো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের বড় প্রাপ্তি নয়; কিন্তু তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের সাফল্য তাঁকে যে তৃপ্তি দেয়, সেটিই তাঁর কাছে বড় অর্জন।

অভিভাবকদের বিশ্বাসের জায়গাটি ধরে রেখে শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি।

একটি বিদ্যালয় পরিচালনায় যেখানে একাধিক শিক্ষক, কর্মচারী ও নানা সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন, সেখানে একজন মানুষ ৩২ বছর ধরে প্রায় একাই সামলে যাচ্ছেন পুরো দায়িত্ব। বড় বেতন নেই, বড় অবকাঠামো নেই—আছে শুধু দায়িত্ববোধ, শিক্ষার্থীদের প্রতি মমতা এবং শিক্ষকতার প্রতি গভীর ভালোবাসা।

দোলন ভৌমিকের গল্প তাই শুধু একজন শিক্ষকের গল্প নয়। এটি একটি ছোট্ট বিদ্যালয়কে ঘিরে মানুষের আস্থা, ভালোবাসা, সংগ্রাম এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্বপ্ন গড়ে ওঠার গল্প।

আজ তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষার্থী, কেউ সরকারি চাকরিতে, কেউ দেশের সীমানা পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের সাফল্যের পেছনে অনেক মানুষের অবদান থাকলেও শৈশবের সেই প্রথম পাঠের শিক্ষককে তাঁরা ভুলে যাননি।

আর সেই প্রথম পাঠের শিক্ষক হিসেবে দোলন ভৌমিক আজও দাঁড়িয়ে আছেন বিন্নাটি মিশু বিদ্যানিকেতনে—সামান্য সম্মানীতে, অসামান্য দায়িত্ব নিয়ে।

৩২ বছর পেরিয়েও তাঁর শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিন আসে নতুন মুখ। নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে তুলতেই দোলন ভৌমিক যেন প্রতিদিন নতুন করে লিখে চলেছেন নিজের শিক্ষকতা জীবনের গল্প।


সরেজমিন নিউজ


কপিরাইট © ২০২৬ সরেজমিন নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত