ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে হামলার আগে নজরদারি, হত্যার প্রস্তুতি, হামলার পর পালানোর পরিকল্পনা এবং ভারতে আত্মগোপনের বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
তদন্তে হামলায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদকে প্রধান শুটার এবং মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেল চালক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যান বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
তবে তদন্তে উঠে আসা এসব তথ্য এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই হাদির চলাফেরা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল। তদন্তকারীদের দাবি, ফয়সাল ও আলমগীর বিভিন্ন পরিচয়ে হাদির আশপাশে অবস্থান করে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত, সম্ভাব্য গন্তব্য এবং নিরাপত্তার ধরন সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেন।
৯ ডিসেম্বর ঢাকার সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে হাদির সঙ্গে কয়েকজনের একটি বৈঠকে ফয়সালের উপস্থিতির তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা এই উপস্থিতিকে হামলার আগে সম্ভাব্য প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তদন্তে বলা হয়েছে, ১২ ডিসেম্বর দুপুরে হাদি মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে যান। কিছুক্ষণ পর ফয়সাল ও আলমগীর একটি মোটরসাইকেলে করে মসজিদের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান নেন।
নামাজ শেষে হাদি মসজিদ থেকে বের হয়ে একটি অটোরিকশায় উঠলে তাঁকে অনুসরণ করা হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পরে বক্স কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ফয়সাল গুলি করেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।
হামলার পর তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়ার পর ১৮ ডিসেম্বর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রাথমিক তদন্তে ফয়সাল করিম মাসুদকে গুলি চালানো ব্যক্তি এবং আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেল চালক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা বিভিন্ন মোবাইল নম্বর, কল ডিটেইল রেকর্ড, আইএমইআই তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সন্দেহভাজনদের অবস্থান বিশ্লেষণ করে হামলার সঙ্গে আরও কয়েকজনের যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
তবে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীতের কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিজেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতের বিচারেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বিভিন্ন মোবাইল নম্বর, কল রেকর্ড, আইএমইআই এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, হামলার আগে ও পরে কয়েকটি মোবাইল নম্বর অল্প সময়ের জন্য সক্রিয় ছিল।
কিছু নম্বর অন্য ব্যক্তির পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। একই আইএমইআই নম্বরের সঙ্গে একাধিক সিম ব্যবহারের বিষয়টিও তদন্তকারীরা যাচাই করেছেন।
এসব প্রযুক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে হামলার আগে ও পরে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অবস্থান এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ধরন শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে হামলার আগের রাত ও ঘটনার দিন কয়েকজন সন্দেহভাজনের বিভিন্ন এলাকায় চলাচলের কথাও উঠে এসেছে। কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, উত্তরা, বিমানবন্দর, আগারগাঁও ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকজনের অবস্থান ও পারস্পরিক যোগাযোগের তথ্য তদন্তকারীদের নজরে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সাভারের একটি আবাসিক স্থাপনাতেও হামলার আগের দিন কয়েকজন সন্দেহভাজনের অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে তাঁদের অবস্থানের উদ্দেশ্য এবং হামলাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের দাবি, হামলার পর ফয়সাল ও আলমগীর দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। পরে তাঁরা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্ত পার হওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় একটি চক্রের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। পরে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
ভারতে তাঁদের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশ ও পরিচয়সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে আরও দাবি করা হয়েছে, ভারতে অবস্থানকালে ফয়সাল নিজের পরিচয় গোপন করে নতুন পরিচয়পত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেন। ভারতীয় নথিপত্র ও এ কাজে সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে তাঁদের সম্ভাব্য সহযোগী, অর্থের উৎস এবং পালানোর পথ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে বলেও তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি রয়েছে।
তবে এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত সত্যতা এখনো আদালতে যাচাই হয়নি।
তদন্তে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীর নামও এসেছে। তাঁকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাপ্পী ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভ্রমণ ভিসায় ভারত যান এবং কলকাতায় অবস্থান করেন। সেখানে তিনি পরিচয় গোপন করে ভারতীয় কিছু নথি সংগ্রহ করেছেন বলেও তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাপ্পীর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
হাদি হত্যার ঘটনায় প্রথম দফায় ১৭ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে ওই তদন্ত নিয়ে আপত্তি জানানো হয়।
তাদের অভিযোগ ছিল, সরাসরি হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হলেও হত্যার পেছনে সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও সহযোগীদের বিষয়ে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান হয়নি।
এরপর আদালতে নারাজি আবেদন করা হলে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বর্তমান তদন্তে শুধু হামলাকারীদের শনাক্ত করাই নয়, পুরো হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
হাদির চলাচল সম্পর্কে কারা তথ্য সংগ্রহ করেছিল, হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র কোথা থেকে এসেছিল, অর্থের উৎস কী ছিল এবং হামলার পর কারা সন্দেহভাজনদের আশ্রয় বা পালানোর সুযোগ করে দিয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা।
একই সঙ্গে সীমান্ত পারাপারে সম্ভাব্য সহযোগী, ভারতে যাওয়ার পর যোগাযোগ এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়ও যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তের বিভিন্ন তথ্য যাচাই, ভারত থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে অনুসন্ধানের কারণে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় একাধিকবার পিছিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সর্বশেষ নির্ধারিত সময়েও তদন্ত প্রতিবেদন জমা না পড়ায় মামলার পরবর্তী অগ্রগতি এখন তদন্তের ফলাফল ও আদালতের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে।
ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণসংক্রান্ত চুক্তি থাকলেও ভারতে তাঁদের বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া প্রত্যর্পণকে জটিল করে তুলতে পারে।
ভারতে চলমান মামলার নিষ্পত্তি, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, আসামিদের পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং দুই দেশের আইনি প্রক্রিয়ার সমন্বয়—এসব বিষয় প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হাদি হত্যা মামলার তদন্ত এখন শুধু ঘটনাস্থল ও সরাসরি হামলাকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হামলার আগে নজরদারি থেকে শুরু করে অস্ত্র সংগ্রহ, অর্থের উৎস, হামলার পর পালানোর ব্যবস্থা, সীমান্ত পারাপার এবং ভারতে অবস্থানের সময় সহযোগিতাকারীদের বিষয়েও তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তে উঠে আসা বিভিন্ন নাম ও অভিযোগের কতটা আদালতে প্রমাণিত হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। সিআইডির অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের পূর্ণ চিত্র আরও পরিষ্কার হওয়ার কথা।
.png)
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ আগস্ট ২০২৬
ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে হামলার আগে নজরদারি, হত্যার প্রস্তুতি, হামলার পর পালানোর পরিকল্পনা এবং ভারতে আত্মগোপনের বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
তদন্তে হামলায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদকে প্রধান শুটার এবং মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেল চালক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যান বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
তবে তদন্তে উঠে আসা এসব তথ্য এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই হাদির চলাফেরা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল। তদন্তকারীদের দাবি, ফয়সাল ও আলমগীর বিভিন্ন পরিচয়ে হাদির আশপাশে অবস্থান করে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত, সম্ভাব্য গন্তব্য এবং নিরাপত্তার ধরন সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেন।
৯ ডিসেম্বর ঢাকার সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে হাদির সঙ্গে কয়েকজনের একটি বৈঠকে ফয়সালের উপস্থিতির তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা এই উপস্থিতিকে হামলার আগে সম্ভাব্য প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তদন্তে বলা হয়েছে, ১২ ডিসেম্বর দুপুরে হাদি মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে যান। কিছুক্ষণ পর ফয়সাল ও আলমগীর একটি মোটরসাইকেলে করে মসজিদের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান নেন।
নামাজ শেষে হাদি মসজিদ থেকে বের হয়ে একটি অটোরিকশায় উঠলে তাঁকে অনুসরণ করা হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পরে বক্স কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ফয়সাল গুলি করেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।
হামলার পর তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়ার পর ১৮ ডিসেম্বর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রাথমিক তদন্তে ফয়সাল করিম মাসুদকে গুলি চালানো ব্যক্তি এবং আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেল চালক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা বিভিন্ন মোবাইল নম্বর, কল ডিটেইল রেকর্ড, আইএমইআই তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সন্দেহভাজনদের অবস্থান বিশ্লেষণ করে হামলার সঙ্গে আরও কয়েকজনের যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
তবে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীতের কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিজেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতের বিচারেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বিভিন্ন মোবাইল নম্বর, কল রেকর্ড, আইএমইআই এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, হামলার আগে ও পরে কয়েকটি মোবাইল নম্বর অল্প সময়ের জন্য সক্রিয় ছিল।
কিছু নম্বর অন্য ব্যক্তির পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। একই আইএমইআই নম্বরের সঙ্গে একাধিক সিম ব্যবহারের বিষয়টিও তদন্তকারীরা যাচাই করেছেন।
এসব প্রযুক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে হামলার আগে ও পরে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অবস্থান এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ধরন শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে হামলার আগের রাত ও ঘটনার দিন কয়েকজন সন্দেহভাজনের বিভিন্ন এলাকায় চলাচলের কথাও উঠে এসেছে। কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, উত্তরা, বিমানবন্দর, আগারগাঁও ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকজনের অবস্থান ও পারস্পরিক যোগাযোগের তথ্য তদন্তকারীদের নজরে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সাভারের একটি আবাসিক স্থাপনাতেও হামলার আগের দিন কয়েকজন সন্দেহভাজনের অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে তাঁদের অবস্থানের উদ্দেশ্য এবং হামলাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের দাবি, হামলার পর ফয়সাল ও আলমগীর দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। পরে তাঁরা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্ত পার হওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় একটি চক্রের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। পরে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
ভারতে তাঁদের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশ ও পরিচয়সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে আরও দাবি করা হয়েছে, ভারতে অবস্থানকালে ফয়সাল নিজের পরিচয় গোপন করে নতুন পরিচয়পত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেন। ভারতীয় নথিপত্র ও এ কাজে সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে তাঁদের সম্ভাব্য সহযোগী, অর্থের উৎস এবং পালানোর পথ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে বলেও তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি রয়েছে।
তবে এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত সত্যতা এখনো আদালতে যাচাই হয়নি।
তদন্তে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীর নামও এসেছে। তাঁকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাপ্পী ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভ্রমণ ভিসায় ভারত যান এবং কলকাতায় অবস্থান করেন। সেখানে তিনি পরিচয় গোপন করে ভারতীয় কিছু নথি সংগ্রহ করেছেন বলেও তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাপ্পীর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
হাদি হত্যার ঘটনায় প্রথম দফায় ১৭ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে ওই তদন্ত নিয়ে আপত্তি জানানো হয়।
তাদের অভিযোগ ছিল, সরাসরি হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হলেও হত্যার পেছনে সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও সহযোগীদের বিষয়ে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান হয়নি।
এরপর আদালতে নারাজি আবেদন করা হলে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বর্তমান তদন্তে শুধু হামলাকারীদের শনাক্ত করাই নয়, পুরো হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
হাদির চলাচল সম্পর্কে কারা তথ্য সংগ্রহ করেছিল, হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র কোথা থেকে এসেছিল, অর্থের উৎস কী ছিল এবং হামলার পর কারা সন্দেহভাজনদের আশ্রয় বা পালানোর সুযোগ করে দিয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা।
একই সঙ্গে সীমান্ত পারাপারে সম্ভাব্য সহযোগী, ভারতে যাওয়ার পর যোগাযোগ এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়ও যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তের বিভিন্ন তথ্য যাচাই, ভারত থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে অনুসন্ধানের কারণে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় একাধিকবার পিছিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সর্বশেষ নির্ধারিত সময়েও তদন্ত প্রতিবেদন জমা না পড়ায় মামলার পরবর্তী অগ্রগতি এখন তদন্তের ফলাফল ও আদালতের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে।
ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণসংক্রান্ত চুক্তি থাকলেও ভারতে তাঁদের বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া প্রত্যর্পণকে জটিল করে তুলতে পারে।
ভারতে চলমান মামলার নিষ্পত্তি, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, আসামিদের পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং দুই দেশের আইনি প্রক্রিয়ার সমন্বয়—এসব বিষয় প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হাদি হত্যা মামলার তদন্ত এখন শুধু ঘটনাস্থল ও সরাসরি হামলাকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হামলার আগে নজরদারি থেকে শুরু করে অস্ত্র সংগ্রহ, অর্থের উৎস, হামলার পর পালানোর ব্যবস্থা, সীমান্ত পারাপার এবং ভারতে অবস্থানের সময় সহযোগিতাকারীদের বিষয়েও তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তে উঠে আসা বিভিন্ন নাম ও অভিযোগের কতটা আদালতে প্রমাণিত হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। সিআইডির অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের পূর্ণ চিত্র আরও পরিষ্কার হওয়ার কথা।
.png)
আপনার মতামত লিখুন