সরেজমিন নিউজ

তৃতীয় অধিবেশনে উত্তপ্ত হতে পারে সংসদ, আলোচনায় দুই গুরুত্বপূর্ণ বিল



তৃতীয় অধিবেশনে উত্তপ্ত হতে পারে সংসদ, আলোচনায় দুই গুরুত্বপূর্ণ বিল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। বেলা ৩টায় বসবে অধিবেশনের প্রথম বৈঠক। স্বাভাবিক নিয়মে এ সময়ের অধিবেশন তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত হলেও এবারের অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিল উত্থাপন ও পাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ-গ্যাস ও সারসংকটের মতো জনসম্পৃক্ত বিষয় নিয়ে সংসদে উত্তাপ ছড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের অধিবেশনে এখন পর্যন্ত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনসহ তিনটি বিল জমা পড়েছে। আরও কয়েকটি বিল আসতে পারে। সব মিলিয়ে অধিবেশনটি ১০ থেকে ১১ কার্যদিবস চলতে পারে। তবে চূড়ান্ত সময়সীমা অধিবেশন শুরুর আগে কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে নির্ধারিত হবে।

এবারের অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হতে পারে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলোর পর্যালোচনা ও নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ হিসেবে এ দুটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া গত ৩ আগস্ট এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায়। এরপর থেকেই মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ খসড়ার কয়েকটি ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, দুই খসড়ায় ইতিবাচক কিছু বিষয় থাকলেও মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে আগের উদ্বেগের সবগুলো সমাধান হয়নি। গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা সীমিত রাখার বিষয়টিও সমালোচনার মুখে পড়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টিও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। দলটির অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনের কিছু বিধান দায়মুক্তির সংস্কৃতি বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে। গুমের অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দলটি।

ফলে বিল দুটি সংসদে উত্থাপনের পর আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব এবং যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে বিরোধী দল ও অন্যান্য সদস্যদের বক্তব্যে অধিবেশন সরব হয়ে উঠতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে এসব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে সেগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়। আরও সাতটি অধ্যাদেশ পৃথক রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়।

গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন-সংক্রান্ত সংশোধনীসহ যেসব অধ্যাদেশ সময়মতো আইনে রূপ দেওয়া যায়নি, সেগুলো পর্যালোচনা করে নতুনভাবে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন তারই অংশ।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনর্বহালের জন্য আগের অধিবেশনে বিল পাস করা হয়েছিল। একই সঙ্গে কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার কথা জানিয়েছিল সরকার। এবার সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নতুন খসড়া সংসদে আসছে।

মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সংসদে বিল উত্থাপন করবেন। এরপর সেটি পরীক্ষা ও প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হবে।

কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিলটি সংসদে বিবেচনা ও পাসের জন্য তোলা হবে। এ সময় কোনো সংসদ সদস্য বিলটি জনমত যাচাই বা অধিকতর পরীক্ষা করার জন্য কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দিতে পারেন। পাশাপাশি সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগও থাকবে।

ফলে অধিবেশনে বিল দুটি শুধু উত্থাপন নয়, এর প্রতিটি ধাপেই আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ থাকছে।

বিল ও আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এবারের অধিবেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন।

ত্রয়োদশ সংসদে মোট ৫০টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে বিষয়ভিত্তিক ছয়টি ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক নয়টি—মোট ১৫টি কমিটি ইতিমধ্যে গঠিত হয়েছে। বাকি ৩৫টি কমিটি এবার গঠনের কথা রয়েছে।

কার্যপ্রণালিবিধি অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম তিনটি অধিবেশনের মধ্যেই মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হয়। সেই সময়সীমার মধ্যে এবারের অধিবেশনেই অধিকাংশ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে পরিকল্পনা এবং আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুল মঈন খান ও আন্দালিভ রহমান পার্থ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় ওই দুটি কমিটিও পুনর্গঠন করতে হবে।

আইন প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের বাইরে চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, সারসংকটসহ জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও সংসদে আলোচনা হতে পারে। ফলে তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি হলেও এবারের অধিবেশন রাজনৈতিক ও জনস্বার্থের দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন—দুটি বিল শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সংশোধন ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে সংসদে অনুমোদন পায়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের।

আপনার মতামত লিখুন

সরেজমিন নিউজ

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


তৃতীয় অধিবেশনে উত্তপ্ত হতে পারে সংসদ, আলোচনায় দুই গুরুত্বপূর্ণ বিল

প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। বেলা ৩টায় বসবে অধিবেশনের প্রথম বৈঠক। স্বাভাবিক নিয়মে এ সময়ের অধিবেশন তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত হলেও এবারের অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিল উত্থাপন ও পাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ-গ্যাস ও সারসংকটের মতো জনসম্পৃক্ত বিষয় নিয়ে সংসদে উত্তাপ ছড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের অধিবেশনে এখন পর্যন্ত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনসহ তিনটি বিল জমা পড়েছে। আরও কয়েকটি বিল আসতে পারে। সব মিলিয়ে অধিবেশনটি ১০ থেকে ১১ কার্যদিবস চলতে পারে। তবে চূড়ান্ত সময়সীমা অধিবেশন শুরুর আগে কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে নির্ধারিত হবে।

এবারের অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হতে পারে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলোর পর্যালোচনা ও নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ হিসেবে এ দুটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া গত ৩ আগস্ট এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায়। এরপর থেকেই মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ খসড়ার কয়েকটি ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, দুই খসড়ায় ইতিবাচক কিছু বিষয় থাকলেও মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে আগের উদ্বেগের সবগুলো সমাধান হয়নি। গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা সীমিত রাখার বিষয়টিও সমালোচনার মুখে পড়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টিও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। দলটির অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনের কিছু বিধান দায়মুক্তির সংস্কৃতি বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে। গুমের অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দলটি।

ফলে বিল দুটি সংসদে উত্থাপনের পর আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব এবং যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে বিরোধী দল ও অন্যান্য সদস্যদের বক্তব্যে অধিবেশন সরব হয়ে উঠতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে এসব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে সেগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়। আরও সাতটি অধ্যাদেশ পৃথক রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়।

গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন-সংক্রান্ত সংশোধনীসহ যেসব অধ্যাদেশ সময়মতো আইনে রূপ দেওয়া যায়নি, সেগুলো পর্যালোচনা করে নতুনভাবে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন তারই অংশ।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনর্বহালের জন্য আগের অধিবেশনে বিল পাস করা হয়েছিল। একই সঙ্গে কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার কথা জানিয়েছিল সরকার। এবার সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নতুন খসড়া সংসদে আসছে।

মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সংসদে বিল উত্থাপন করবেন। এরপর সেটি পরীক্ষা ও প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হবে।

কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিলটি সংসদে বিবেচনা ও পাসের জন্য তোলা হবে। এ সময় কোনো সংসদ সদস্য বিলটি জনমত যাচাই বা অধিকতর পরীক্ষা করার জন্য কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দিতে পারেন। পাশাপাশি সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগও থাকবে।

ফলে অধিবেশনে বিল দুটি শুধু উত্থাপন নয়, এর প্রতিটি ধাপেই আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ থাকছে।

বিল ও আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এবারের অধিবেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন।

ত্রয়োদশ সংসদে মোট ৫০টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে বিষয়ভিত্তিক ছয়টি ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক নয়টি—মোট ১৫টি কমিটি ইতিমধ্যে গঠিত হয়েছে। বাকি ৩৫টি কমিটি এবার গঠনের কথা রয়েছে।

কার্যপ্রণালিবিধি অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম তিনটি অধিবেশনের মধ্যেই মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হয়। সেই সময়সীমার মধ্যে এবারের অধিবেশনেই অধিকাংশ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে পরিকল্পনা এবং আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুল মঈন খান ও আন্দালিভ রহমান পার্থ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় ওই দুটি কমিটিও পুনর্গঠন করতে হবে।

আইন প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের বাইরে চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, সারসংকটসহ জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও সংসদে আলোচনা হতে পারে। ফলে তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি হলেও এবারের অধিবেশন রাজনৈতিক ও জনস্বার্থের দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন—দুটি বিল শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সংশোধন ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে সংসদে অনুমোদন পায়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের।


সরেজমিন নিউজ


কপিরাইট © ২০২৬ সরেজমিন নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত