সরেজমিন নিউজ

ছয় মাস বাবার কণ্ঠ শোনেননি ইমরানের দুই ছেলে, বাড়ছে উদ্বেগ


প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

ছয় মাস বাবার কণ্ঠ শোনেননি ইমরানের দুই ছেলে, বাড়ছে উদ্বেগ

পাকিস্তানের কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস ধরে সরাসরি কথা বলতে পারেননি তাঁর দুই ছেলে সুলাইমান খান ও কাসিম খান। সর্বশেষ গত মার্চে ঈদুল ফিতরের সময় বাবার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল তাঁদের। সেই কথোপকথনও স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ২০ মিনিট।

আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইমরানের ছেলে কাসিম খান জানান, বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তিনি ও তাঁর ভাই সাধারণত বাবার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জানতে চান। তবে ইমরান খান নিজের পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত বলতে আগ্রহ দেখান না। বরং ছেলেদের খোঁজখবর নেওয়া এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার মধ্যেই কথোপকথন সীমিত থাকে।

৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী রয়েছেন। ২০২২ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য প্রকাশ এবং রাষ্ট্রীয় উপহার নিয়ে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। তবে ইমরান খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

তাঁর পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) বরাবরই দাবি করে আসছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁকে এসব মামলায় জড়ানো হয়েছে।

সম্প্রতি ইমরান খানের দুই বোন উজমা ও নওরিন তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। কয়েক মাসের মধ্যে সেটিই ছিল পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎগুলোর একটি।

সাক্ষাতের পর ইমরানের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁর দুই ছেলে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় একাকী কারাবাসের কারণে ইমরান মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। তাঁর হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং উদ্বেগের মতো সমস্যার কথাও জানিয়েছেন কাসিম।

এর আগে ইমরানের আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন, তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পরিবারের দাবি, সাম্প্রতিক সাক্ষাতের সময়ও তাঁর চোখে পট্টি দেখা গেছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে ইমরানকে পর্যাপ্ত দর্শনার্থীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি এবং সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগও সীমিত রাখা হয়েছে।

ইমরানের স্বাস্থ্য ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে গত ১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেন। তিন বিচারপতির বেঞ্চ ইমরানকে দুই দিনের মধ্যে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

আদালত একই সঙ্গে সপ্তাহে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দুই ছেলের সঙ্গে সপ্তাহে দুবার ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত বোনকে চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

তবে পরিবারের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে সরকারি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে নেওয়া হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে ২০ আগস্ট তাঁকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

এ ঘটনায় ইমরানের দল আদালত অবমাননার আবেদন করেছে।

ইমরানের পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় পাকিস্তান সরকার। দেশটির তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বলেছে, ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে কারাগার ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নথির মিল নেই।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, কারাবন্দী হওয়ার পর ইমরানের প্রায় ৩০ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। কারাগারের চিকিৎসকেরাও নিয়মিত তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। সাম্প্রতিক পরীক্ষায় তাঁর গুরুতর বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো কোনো শারীরিক অবনতির তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইমরান খানের মুক্তি ও তাঁর অধিকার নিশ্চিত করার দাবি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল থেকেও এসেছে। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন তাঁর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সাবেক ক্রিকেটারদের একটি অংশও তাঁর মুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

ইমরানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথও যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, ইমরান দীর্ঘ সময় ধরে একাকী কারাবাসে রয়েছেন এবং এটি মানবাধিকারসংক্রান্ত গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইমরানের দুই ছেলে ব্রিটিশ নাগরিক হলেও তাঁদের পাকিস্তানে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ নিয়েও জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেমিমা। ২০২২ সালের নভেম্বরে বাবার ওপর হামলার পর তাঁরা সর্বশেষ পাকিস্তানে গিয়ে ইমরানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

বর্তমানে বাবার মুক্তির জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানাতে চান না সুলাইমান ও কাসিম। তবে তাঁরা বলছেন, পরিস্থিতি কঠিন হলেও ইমরানের মানসিক দৃঢ়তার ওপর তাঁদের আস্থা রয়েছে।

কাসিমের ভাষায়, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাঁর বাবার রয়েছে—এমন বিশ্বাস এখনো তাঁরা হারাননি।

আপনার মতামত লিখুন

সরেজমিন নিউজ

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ছয় মাস বাবার কণ্ঠ শোনেননি ইমরানের দুই ছেলে, বাড়ছে উদ্বেগ

প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

পাকিস্তানের কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস ধরে সরাসরি কথা বলতে পারেননি তাঁর দুই ছেলে সুলাইমান খান ও কাসিম খান। সর্বশেষ গত মার্চে ঈদুল ফিতরের সময় বাবার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল তাঁদের। সেই কথোপকথনও স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ২০ মিনিট।

আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইমরানের ছেলে কাসিম খান জানান, বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তিনি ও তাঁর ভাই সাধারণত বাবার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জানতে চান। তবে ইমরান খান নিজের পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত বলতে আগ্রহ দেখান না। বরং ছেলেদের খোঁজখবর নেওয়া এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার মধ্যেই কথোপকথন সীমিত থাকে।

৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী রয়েছেন। ২০২২ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য প্রকাশ এবং রাষ্ট্রীয় উপহার নিয়ে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। তবে ইমরান খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

তাঁর পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) বরাবরই দাবি করে আসছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁকে এসব মামলায় জড়ানো হয়েছে।

সম্প্রতি ইমরান খানের দুই বোন উজমা ও নওরিন তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। কয়েক মাসের মধ্যে সেটিই ছিল পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎগুলোর একটি।

সাক্ষাতের পর ইমরানের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁর দুই ছেলে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় একাকী কারাবাসের কারণে ইমরান মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। তাঁর হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং উদ্বেগের মতো সমস্যার কথাও জানিয়েছেন কাসিম।

এর আগে ইমরানের আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন, তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পরিবারের দাবি, সাম্প্রতিক সাক্ষাতের সময়ও তাঁর চোখে পট্টি দেখা গেছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে ইমরানকে পর্যাপ্ত দর্শনার্থীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি এবং সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগও সীমিত রাখা হয়েছে।

ইমরানের স্বাস্থ্য ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে গত ১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেন। তিন বিচারপতির বেঞ্চ ইমরানকে দুই দিনের মধ্যে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

আদালত একই সঙ্গে সপ্তাহে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দুই ছেলের সঙ্গে সপ্তাহে দুবার ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত বোনকে চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

তবে পরিবারের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে সরকারি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে নেওয়া হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে ২০ আগস্ট তাঁকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

এ ঘটনায় ইমরানের দল আদালত অবমাননার আবেদন করেছে।

ইমরানের পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় পাকিস্তান সরকার। দেশটির তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বলেছে, ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে কারাগার ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নথির মিল নেই।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, কারাবন্দী হওয়ার পর ইমরানের প্রায় ৩০ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। কারাগারের চিকিৎসকেরাও নিয়মিত তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। সাম্প্রতিক পরীক্ষায় তাঁর গুরুতর বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো কোনো শারীরিক অবনতির তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইমরান খানের মুক্তি ও তাঁর অধিকার নিশ্চিত করার দাবি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল থেকেও এসেছে। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন তাঁর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সাবেক ক্রিকেটারদের একটি অংশও তাঁর মুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

ইমরানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথও যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, ইমরান দীর্ঘ সময় ধরে একাকী কারাবাসে রয়েছেন এবং এটি মানবাধিকারসংক্রান্ত গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইমরানের দুই ছেলে ব্রিটিশ নাগরিক হলেও তাঁদের পাকিস্তানে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ নিয়েও জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেমিমা। ২০২২ সালের নভেম্বরে বাবার ওপর হামলার পর তাঁরা সর্বশেষ পাকিস্তানে গিয়ে ইমরানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

বর্তমানে বাবার মুক্তির জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানাতে চান না সুলাইমান ও কাসিম। তবে তাঁরা বলছেন, পরিস্থিতি কঠিন হলেও ইমরানের মানসিক দৃঢ়তার ওপর তাঁদের আস্থা রয়েছে।

কাসিমের ভাষায়, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাঁর বাবার রয়েছে—এমন বিশ্বাস এখনো তাঁরা হারাননি।


সরেজমিন নিউজ


কপিরাইট © ২০২৬ সরেজমিন নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত